“বহুদিন তার খোঁজ ছিল না
ভাবলাম যাক বাঁচা গেল
এ এক জটিল ধাঁধা…
যতটা জড়িয়ে রাখতে চাই তারও বেশি দূরে যেতে চাই”
[জড়িয়ে রাখতে চাই]
শাহানা সিরাজী কার উদ্দেশ্যে উপরে উদ্ধৃত কবিতা লিখেছিলেন? যার উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন তিনি কি পড়েছেন এই কবিতা কোনোদিন? শাহানা সিরাজী একইসঙ্গে একজন কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং সামজচিন্তক। তিনি চমৎকার অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। গানও করেন মাঝে মাঝে। গলায় সুর আছে যথেষ্ট। তাঁর কবিতা,– নাকি কথাসাহিত্য,—কোনটি বেশি সমৃদ্ধ, তার উত্তর এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই। কারণ হাতের কাছে বই আছে বটে কিন্তু আমি তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসগুলো এখনও পড়িনি। শাহানা সিরাজীর সাথে আমার পরিচয় চাকরিসূত্রে। তিনি পিটিআই-এর একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় ইনস্ট্রাক্টর। আমি যখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি করতাম, সহসায় তিনি একদিন আমার চেম্বারে উপস্থিত। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও নাকি ধান ভানে। কবিরা যেখানেই পেটের ভাতে জোগাড়ের কাজে নিয়োজিত থাকেন, সেখানেই কবিতার চর্চা করেন। শাহানা সিরাজীর চাকরি, সংসার, সাহিত্যচর্চা –সব মিলিয়ে সেটি একটা দীর্ঘ ও নিরন্তর জীবনযুদ্ধ, একথা তাঁর সাথে সেদিনের আলাপেই বুঝে নিয়েছিলাম আমি। শাহানা সিরাজী খুব দ্রুত আপন করে নিতে পারেন মানুষকে। একবিংশ শতাব্দীর রাজধানী কেন্দ্রিক সমাজের কথা বিবেচনায় নিলে স্বীকার করতেই হয়,– এটা তাঁর একটি বিরল গুণ। লীনা এবং শাহানা সিরাজী– দুজন দুজনার এমন বন্ধু যেটাকে আবহমান গ্রামবাংলার “সই” সম্পর্কের সাথে তুলনা করা যায়।
আমার সাথে শাহানা সিরাজীর সম্পর্কটা একইসঙ্গে লেখকের এবং অফিসিয়িাল। আমি ব্যাচমেট ছাড়া জুনিয়র-সিনিয়র নারী সহকর্মীসহ সকল নারীকে “ম্যাডাম” বলে সম্বোধন করে এসেছি, সেই সূত্রে তাঁকেও ম্যাডাম সম্বোধন করে এসেছি। তিনি ন্যায়পরায়ণ মানুষ। আমার জানামতে ভয়ে কিংবা লোভে তিনি কখনোই কোনো অন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করেননি। দলবাজ লেখকদের দেশে চাকরি ও সাহিত্যচর্চা করেও সর্বপ্রকার দলান্ধতা থেকে মুক্ত তাঁর ভাবনা ও সৃষ্টিকর্ম। তিনি লেখক বলেই আমার সাথে তাঁর একদিনের অফিসিয়াল সাক্ষাৎ পরবর্তী সাক্ষাৎগুলোর মাধ্যমে চিরদিনের সম্পর্কে ফলে উঠেছে দিনদিন। একজন লেখক হিসেবে সকল ক্ষেত্রেই লেখকদের প্রতি আমার একধরনের পক্ষপাত রয়েই যায়— ঘটেই থাকে। এটা যদি পক্ষপাতজনিত দোষ হয়ে থাকে, তাও কিছু করার নেই আমার। মানুষ কি ১০০% ক্ষেত্রেই ১০০% নিরপেক্ষ থাকতে পারে? না।
ধান ভানতে শিবের গীত কিংবা গাজীর গীত যা-ই বলি না কেন, শাহানা সিরাজীর কবিতা নিয়ে দুচার কথা লিখতে বসে শুরুতেই তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ও নানাসময়ের কথাবর্তার প্রসঙ্গ একারণেই টানলাম যে— তাঁর কবিতায় তাঁর ব্যক্তিত্বের ছাপ পড়েছে বলে লক্ষ করেছি। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে পরিমিতিবোধ, অনুদ্ধত ও অপ্রগলভ আলাপন, আচরণ ও অভিব্যক্তির মাধুর্য এবং সকল প্রকার মিথস্ক্রিয়ায় পরিশীলিত শিষ্টাচারবোধ। তিনি বিপ্লবী বা বিদ্রোহী গোছের কবি নন। কিন্তু তাঁর কবিতার মধ্যে প্রতিবাদ আছে, ক্ষোভ আছে, ন্যায়ের প্রতি অনুরাগ আছে তবে সবই আছে শৈল্পিক সৌন্দর্যের সীমানার মধ্যে—পরিশীলিত অভিব্যক্তির ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ হয়ে।
আমরা এখন ঢাকা শহরে খুব কাছাকাছি আবাসনে থাকি– পায়ে হেঁটে সর্বোচ্চ ১০/১২ মিনিটের পথ। অথচ আমাদের মধ্যে প্রায় দুই বছর দেখা নেই। কিন্তু চোখের আড়াল হলেও মনের আড়াল নেই এতটুকু। সেলফোনে কথা হয় মাঝেমাঝে। গতকাল সন্ধ্যায় আমি এবং লীনা সান্ধ্যকালীন হাাঁটার সময় শাহানা সিরাজীর ফ্ল্যাটের সামনে দিয়ে যেতে যেতে তাঁর কথা বলছিলাম— নিজেদের মধ্যে। ভাবছিলাম একটা ঢুঁ দিই। ঢুঁ দেওয়া হয়নি। তবে তখনই মনে পড়েছিল শাহানার সিরাজীর কবিতার কথা:
“খেয়ালী বাতাস পৌষের হিম ছুঁয়ে কানে কানে বলে
এসেছি, দরজা খোল, অবরোধ তুলে নাও
বুকের সানকি শূন্যতায় দাউ দাউ হেরে যায় রাজনীতি
ভেতরের ছবি এঁকে যেতে চাই বর্ণিল তুলির জ্বলন্ত স্পর্শে”
[খোয়ালী বাতাস]
শাহানা সিরাজী গভীরভাবে জীবনবাদী কবি ও কথাসিাহিত্যিক। আমি পুরুষ হয়েও সত্যের স্বার্থে একথা স্বীকার করতে বাধ্য যে,— পৃথিবী ও মানব সমাজ মূলত পুরুষতন্ত্র শাসিত। রাষ্ট্রক্ষমতায় ট্রাম্প থাক অথবা মার্গারেট থ্যাচার, পুরুষতন্ত্রের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্র। শাহানা সিরাজী আপন বাসার চৌহদ্দীর মধ্যে একজন স্ত্রী, মা এবং কন্যা; আবার চাকরির ভুবনে বহুজনের মাঝে একজন চাকরিজীবী । কিন্তু পুরুষ সহকর্মীদের চোখে শুধুই একজন মহিলা সহকর্মী। তাঁকে প্রায় ঢাকা থেকে ভিন্ন জেলায় দূরের কর্মস্থলে যাতায়াত করতে হয়েছে এবং আজও হয়– ট্রেনে কিংবা বাসে। তিনি এসব কারণে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাহির ও ভেতরের রূপটা নিবিড়ভাবে অবলোকন ও উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছেন। অনেক কবির মতো তিনিও প্রাতিস্বিক অনুভবকে প্রাধ্যান্য দিয়েই কবিতা লিখেছেন। তাঁর সেই অনুভবের মাঝে চেতনে-অবচেতনে মিশে যেতে চেয়েছে সচেতন সক্রিয়তায় একজন কর্মজীবী নারীর বহুমুখী জীবনযুদ্ধের ঘ্রাণ।
“দেয়ালে ঘষে ঘষে পলেস্তরা লাগানো সহজ
ছুটির দিনগুলোতে তাই পলেস্তরা লাগাই
মিস্ত্রি কাজ করে দেখি খুঁত বের করি
আবার ঘষি আবার লাগাই ঝকঝকে দেয়াল
বুকের বাম দিকে পৌষের আকাশের মতো বৃষ্টিহীন ব্যথা
গতরাতের বজ্রপাতে ঝরা সেই পাতা
যে আরো কিছুদিন সূর্যের আলোয় মন্থিত হতে চেয়েছিল
তার কথা ভবে দু’হাতে বুক চেপে বলি—
সবকিছু আমি নিয়ন্ত্রণ করি না….”
[ অসম্পূর্ণ ]
শাহানা সিরাজীর কবিতা কোনো নারীবাদে আসক্ত নয় এবং পুরুষতন্ত্রের মালিক পুরুষজাতির চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধারের কোনো হইচই নেই তাঁর উচ্চারণে। আরও বলা যেতে পারে যে, তাঁর কবিতায় নারীবাচক-পুরুষবাচক উচ্চারণের প্রগলভতা নেই এতটুকু। তাঁর কবিতার পেছনে রচয়িতা হিসেবে তিনি একজন মানুষ। তাঁর নামটি দেখে এবং তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি বলে কবিতা পড়ার সময় মনে হয় যে একজন নারীর মনের কথা ফুটে উঠতে চেয়েছে তাঁর কবিতায় কিন্তু কবিতাগুলো নিজেরা যা ধারণ করেছে তা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল সংবেদনশীল মানুষের অন্তরঙ্গ অনুভূতি। নিশ্চয়ই তাঁর উপলব্ধি ও অভিজ্ঞানের মধ্যে নারীর প্রাতিস্বিক আনন্দ-বেদনার উপকরণ পরোক্ষে প্রভাব রেখেছে কিন্তু উচ্চারণবৈশিষ্ট্যে সেসব জেন্ডার-নিরপেক্ষ চারিত্র্য ও আকর্ষণ ধারণ করেছে।
“সম্পর্ক রক্ষা করতে নার্সিং লাগে
রোগী যেমন রোগ থেকে মুক্তি চায়
মাছ যেমন জল চায়
কেঁচো যেমন মাটি
পাখিও তেমনি আকাশ চায়
আকাশহীন পৃথিবী কোথায় আঁকড়ে রাখবো?”
[অবস্থান]
শাহানা সিরাজীর জীবনবোধ শানিত, গভীর, নিবিড় ও সূক্ষ। আর দশজনের মতো তিনি চর্মচক্ষু দিয়ে জীবন ও সমাজের বহিঃস্তর দেখেছেন কিন্তু তাঁর অন্তর্দৃষ্টি অন্ধকারভেদী টর্চলাইট হয়ে ঢুকে পড়েছে মানুষ কর্তৃক আড়াল করে রাখা অন্তরাল জীবনের আনাচেকানাচে। যাপিত জীবনের নন-রোমান্টিক ধূসর সত্য জীবননিবিড় কাব্যালংকার পরে হয়ে উঠেছে কবিতার সবুজ সুন্দর শৈল্পিক সত্য। ভেতর জগতের বিমূর্ত বিষয়কে বহিঃজগতের মূর্ত বিষয়ে প্রতীকায়িত করে তোলা তাঁর অন্যতম সৃষ্টিশীল অনুশীলন ও আনন্দ। সাফল্যও।
“সরলরেখার যে প্রান্তেই থাকি না কেন
এ সরলরেখাই
হিসেবের খাতা ক্লোজ করা যায় না
প্রতিটি পাতাই নতুন। আজ যাকে সংযোজনের রঙে সাজাই
কাল তা সে ভাবেই কৌণিক অবস্থানে দূরত্ব বাড়ায়
কেবল একটি স্পেস প্রয়োজন হয়–
মানা না মানা ব্যক্তিগত হলেও তুমি আমি পথচারী”
[যৌগিক মিশ্রণ]
শাহানা সিরাজীর কাব্যভাবনার একটি বিশেষ ও প্রায় ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নারীস্বাধীনতার সোচ্চার সময়ের উঠোনেও কেবল নারী-পুরষের সম্পর্কের মধ্যে সীমায়িত হয়ে থাকেনি তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতা কখনো উপমায়, কখনো চিত্রকল্পে, কখনো উৎপ্রেক্ষায়, কখনো-বা রূপকে-প্রতীকে ধারণ করতে চেয়েছে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, পুরুষান্ত্রিক শাসন-শোষণ, ধর্মের নামে সংঘটিত অবিচার ইত্যাদি বিরোধী ক্ষোভের অভিব্যক্তিকে যদিও সেসব উচ্চারণ সর্বদায় পরোক্ষতা ও অনুদ্ধততা বেছে নিয়েছে। তিনি প্রেমের কবিতার ভাঁজে ও খাঁজে বৈশ্বিক চেতনার মণিমুক্ত গুঁজে দিয়েছেন। শাহানার এই সম্প্রসারিত অবলোকন তাঁর কবিতার ভুবনকে মাঝে মাঝে সম্প্রসারিত দিগন্তে নিয়ে যেতে চেয়েছে। তাঁর কবিতা বহুকৌণিক সৌন্দর্য ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।
“প্রেমিকের অুনরাগী চোখে দেখি বাকখালীর গর্জন
মহেশখালীর কী সাধ্য মূলভূখণ্ডের হাতে রাখি পরায়
আলোর মায়ায় দৌড়াদৌড়ির জন্যই সাফা-মারওয়া
জমজম, সভ্যতার জন্ম, মক্কা-মদীনা,
ইব্রাহীম দৃপ্ত-তৃপ্ত তুমি-আমি একাকার
আরাফাত-হাশর চেতনায় লালন করি
অথচ রক্তের হোলিতে আক্রান্ত আমারই অবুঝ মন। “
[নাস্তিক প্রেমিকা]
শাহানা সিরাজী অনেক সময় একরৈখিক ভাবনার কবিতার মধ্যে নানাধরনের ভাবনার সংশ্লেষ রচনা করেন। তাঁর কিছু প্রেমের কবিতার মাঝে রাজনীতির ঘ্রাণ পাওয়া যায়; কোনো কোনো ব্যক্তিগত অনুভবের পঙক্তিমালার মাঝে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রিয়াশীল সাম্রাজ্যবাদের দৃশ্যকণা এসে বসে গেছে, কখনো-বা বর্তমান সময়ের কবিতার উঠোনে এসে আসন পেতেছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এতে করে সেসব কবিতা একমুখী সংকীর্ণ ভাবব্যঞ্জনার একঘেয়েমি থেকে মুক্ত থেকেছে এবং বহুব্যঞ্জন সমৃদ্ধ পরিবেশনার মতো উপাদেয় ও সুস্বাদু ঐশ্বর্য লাভ করেছে। বর্তমান সময়ের পাঠক মানুষ হিসেবে বিশ্বনাগরিক এবং একইসঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের পাঠক। তাদের রুচিকে তৃপ্ত করতে অভিনবত্ব ও বৈচিত্র্য উভয়ই আবশ্যক। শাহানার কিছু কিছু কবিতায় বহুব্যঞ্জন পরিবেশনা আমাদের মুগ্ধ করে। পাঠকের বিবেচনার জন্য একটি পুরো কবিতা তুলে দিচ্ছি:
“পলাশীর বেদনা খুঁড়ে খুঁড়ে কে আসো জাগাতে আবার অস্তমিত সূর্য;
কে বল, মীরজাফর, সেনাপতির পথ ছাড়ো!
অযুত নিনাদে কাঁপে চিরচেনা জন্মসত্তা।
পরানের চাবি পকেটে রেখে কে আসো মুখোশের আড়ালে
স্বপ্নের তোড়া নিয়ে… শিউলির বিস্ফোরিত বুকে অন্তর্গত দাহ চোখে পড়ে?
ক্লাইভের আঘাতে ক্লান্ত বাহাদুর শাহ নির্বাসনে
স্বপ্নালু যাপনের আড়ালে প্রেমেরই জয়গান মননে
পথ যত কমে কিশোর, দূরত্ব তত বাড়ে
আলপিন বাতাস ফুসফুস কেড়ে নেয় ও নিঃশ্বাস কি প্রয়োজন!
তবে এসো নব খিলাফত নির্মাণ করি, খলিফা-অনুসারী-প্রজা
একসাথে বিউগল বাজাই পুরনোর সমাধিতে…
মক্কা-মদিনা-আগ্রা-তাজ-মিশর-রোম প্রলয়ে-প্রণয়ে তুমি-আমি
আগুনের আগুন মুখে কি ছবি আঁক; পতঙ্গের ডানা কেন পুড়ে?
ক্লান্ত দিন একা একা একা পার হয় বাঁশের সাঁকো…”
[পাথর সময়]
শাহানা সিরাজী অপ্রগলভ উচ্চারণ, অনুদ্ধত কণ্ঠ ও গহনচারী ভাষার কবি। তাঁর কবিতায় না-পাওয়ার বেদনা আছে কিন্তু সেটা হাহাকার হয়ে ওঠেন; তাঁর উচ্চারণে দ্বিমত আছে কিন্তু তা ঝগড়ার কণ্ঠে পর্যবসিত হয়নি; তাঁর অনুরাগের কবিতায় অন্তরঙ্গ আবেদন আছে কিন্তু তা নাছোড় দাবির স্লোগানে পরিণত হয়নি; তাঁর কবিতায় মিলনের চিত্রকল্প আছে কিন্তু তা জানালা-দরোজা খোলা শয্যাদৃশ্য রচেনি। তাঁর কবিতা মনোময়, হৃদয়ময় ও অন্তরঙ্গ। প্রকাশশৈলীর গুণে তাঁর একান্ত অন্তরঙ্গ অনুভবের প্রেমের কবিতাও সকল প্রেমিক-প্রেমিকার কবিতায় উন্নীত হয়েছে। পরিশীলিত ভাষার বদৌলতে রিরংসামুখী শরীরনিবিড় অনুভূতি ফ্রয়েডীয় যৌনতার দুর্গন্ধ এড়িয়ে প্রাণময় ভালোবাসার সৌরভে সুরভিত হয়ে উঠেছে। শরীরের ভাষা হৃদয়ের বর্ণমালায় শোভনীয় অভিব্যক্তি লাভ করেছে। কবি হিসেবে এটি তাঁর সুরুচি ও শক্তিমত্তার পরিচয় বহন করে।
“শিথানে আগুন রেখে ফিরে যাব পুরনো গলিতে; অন্ধ গলির প্রান্তে
রেখে আসি পৌষের বৃষ্টি ফাগুনের বিফল হাসি। ক্লান্ত পা ফিরতে গিয়ে ফিরে
দেখে, থাক ভিসুভিয়াস।
মলাটের ভেতর মলাট, মেঘের ভেতর মেঘ, অকারণ হিসেবের খাতা…
এই যে ঝরা পাপড়ির বৃন্ত তার নিঃশ্বাসে কি পাও,
চাঁদিনী চাঁদিনী ছোঁয়ায় জলজ সময় আবার স্তরীভূত হবে?
অন্ধকূপের নীরব বার্তা পারো উদ্ধার করতে?
রাতের দেহে যে রাত পিকাসোর তুলিতে অনন্য চিত্র খোদাই করে,
সে রাত চিরকিশোর উন্মাদনায় লেপ্টে থাকে যমজ ঠোঁটের কোণে।
আবার খুঁড়ি, খুঁজি… অন্ধকার… গভীরতা..ব্যাপ্তি… একাকার”
[ যমজ ঠোঁট ]
শাহানা সিরাজীর বাস্তবতার ধুলি-কাঁকর মাখা বাহ্যিক কবিরূপের আড়ালে একটি রোমান্টিক মন রয়েছে। তাঁর সেই রোমান্টিকতা ডানা মেলে কল্পনার মহাশূন্যে উড়ে যেতে চায়নি; বিপরীতে যাপন ও বিচরণের মাটির ভুবনে সৃষ্টি করতে চেয়েছে স্বপ্নের উঠোন, যৌথ উড়ে বেড়ানোর বাধাহীন দিগন্ত, অনুরাগের নদী এবং মহামিলনের মোহনা।তিনি সত্যের বাহুতে কল্পনার ডানা জুড়ে দিয়েছেন। তাঁর সেই উড়ে যাওয়া মানেই প্রতিবারই আনন্দভ্রমণ শেষে মাটির কাছে ফিরে আসার রোমাঞ্চ এবং মাটির মায়াবী কণা নিয়ে তা আকাশের স্বপ্নময় পথে ছিটিয়ে দেওয়ার আনন্দ। তিনি ভাবনায় বিশ্বচারী তারপরও সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলার প্রতি একটা বিশেষ টান রয়ে গেছে তাঁর চেতনে-অবেচতেনে। সংসার, সমাজভাবনা কিংবা প্রেম—কবিতায় কেন্দ্রীয় বিষয় যাই হোক, পঙক্তিমালার ভাঁজে ও খাঁজে, রসে ও প্রাণে বাংলাকেন্দ্রিক ভালোবাসার ঘ্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে জন্মসূত্রে পাওয়া অভ্যাসে–অনুশীলিত স্বয়ংক্রিয়তায়। আকাশচারী রোমান্টিকতা বাংলা্র ধুলোমাটিজল মেখে সত্যনিষ্ঠ উপভোগ্যতা অর্জন করেছে।
“এসো আবার হেমন্তের নরম বিকেল খুঁজে নিই, নাড়ার আগুনে পুড়ে যাওয়া
ক্ষেতের কানে কান পেতে শুনি প্রথম চিঠি লেখার গল্প, ঘাসফড়িং এর হাসিমাথা
রোদ হাতে নিয়ে হারিয়ে যাই আমন দুপুরে; রূপান্তরিত সময়ের বুক ছিঁড়ে খুঁজে
আনি পলল দিন যার একপাশে মহুয়া অন্যপাশে তুমি। নীলভাষার গোপন চোখে
এঁকে দিই ভেজা স্পর্শ। মাটির কাছে জমা রাখা ঐশ্বর্য বিলিয়ে চলো জীবনের
পথে, নরকাগুন চমকে উঠে, চলো কিশোর, সাতআকাশের ছাদ ভেঙে আবার গড়ি
আকাশ যেখানে থাকবে না জীবনানন্দের সোনালী ডানার চিল কিংবা শরতের
বিরাজ বৌ, শুভদা! বরফ সমুদ্রের নীরবতা নিয়ে বানিয়ে নেবো উছল কোন নগর!”
[ প্রথম চিঠি ]
অন্ত্যমিলহীন অক্ষরবৃত্তেই শাহানা সিরাজীর কাব্য-অনুশীলন এবং উৎসাহ। কিন্তু কবিতার ছন্দের বিষয়ে তাঁর জ্ঞান, সচেতনতা ও সক্রিয়তা উপেক্ষণীয় নয়। তিনি মাঝেমধ্যে দুয়েকটি অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতাও রচনা করেছেন। সেুগলো তাঁর ছন্দজ্ঞান ও কাব্যঝোঁকের বিচারেও বিবেচনাযোগ্য। একটি কবিতার কিয়দংশ পাঠ করা যেতে পারে:
“বাঁশিটি বশ মেনেছে ভেবে আগলে রাখি বুকে
বাঁশির সুরে জেগেছে প্রাণ বুঝতে পারি সুখে
সুখের দোলা ছড়িয়ে পড়ে আগুন রঙা পায়ে
আগুন বলে ঝলসে দেবো দিও না হাত গায়ে।”
[সুবাস]
শাহানা সিরাজী তাঁর ব্যক্তিজীবনের মতো লেখকজীবনেও প্রতিকূলতার কাছে হার-না মানা ব্যক্তিত্ব। তাঁর কবিতায় ব্যর্থতার অশ্রু আছে, না পাওয়ার বিষণ্নতা আছে, চলার পথে সঙ্গী পথচারীকে সবখানি সহমর্মিতায় না পাওয়ার আফসোস আছে কিন্তু পরাজয়ের কাছে নত হওয়ার উচ্চারণ নেই। জীবন মানে সামনে এগিয়ে চলা। পার্থিব জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য নিশ্চিতভাবে কারও জানা নেই । জানা থাকে না। কিন্তু থেমে যাওয়া মানেই জীবনের অকালমৃত্যু। শাহানা সিরাজী চলতে থাকাকেই তাঁর কবিজীবনের পাথেয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। হয়তো এটি তাঁর যাপিতজীবনের অঘোষিত অভিজ্ঞানও।
“যদি ভেঙে পড়ে সব খুঁটি অগোচরে
সব পাতা যদি ঝরে যায় হরিৎক্ষেত্রে
শেষ নিঃশ্বাস লেগে থাকে অনন্ত পথে
তবু রয়ে যাকে নরম স্পর্শ ভালোবাসার দিনে”
[যদি ভেঙে পড়ে সব]
লেখক: আমিনুল ইসলাম।
বাংলাদেশ সরকারের
অবসর প্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
কবি ও প্রাবন্ধিক
আরও পড়ুন।
আরও পড়ুন।
আরও সংবাদ পড়ুন।
আরও পড়ুন।
আরও পড়ুন।
আরও পড়ুন।
আরও পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।
আরও লেখা পড়ুন।



























