রুনুর মায়ের বকবকানি – শাহানা সিরাজী

Picsart_24-06-05_10-16-50-638-1.jpg

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":[],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":false,"containsFTESticker":false}

admin

আজকাল রুনুর মায়ের ভাষার ধরণ বদলে যায় প্রায়শই।
তো গেলাম রুনুর মায়ে কাছে গিয়েই শুনি-

রাস্তায় বের হলেই ইদানিং বকবক করি আপন মনেই। গতকাল একটা ফিচার পড়লাম নিজের সাথে কথা বললেও নাকি মস্তিস্ক ক্লান্তি, রাগ- জেদ -ক্ষোভ পশমিত করে!
আমি বকবক করি কোন কিছু পশমিত করার জন্য নয় বরং মানুষের ভেতর সেই সব ভাবনাগুলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য।
কত কত সিলি মেটার নিয়ে বকবক করি!

কেউ হয়তো চিন্তাও করে না সেই সব উদ্ভট ব্যাপার!
যেমন ধরুন – আজ লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলাম,২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস – এখানে ইচ্ছায় এসেছেন নাকি চাপে ?

তারা উত্তর দিলো চাপে। ব্যস! শুরু হলো বকবক!

কেন চাপে আসবেন? কেন স্বইচ্ছায় আসবেন না? কেন অনুভব করবেন না – স্বাধীন ভূ-খণ্ড না পেলে, সার্বভৌমত্ব না পেলে এই চাকুরি পেতাম না, লেখাপড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি ব্যাপারগুলোয় আমাদের অংশগ্রহণ এতো ব্যাপক হারে থাকতো না। প্রশাসন থেকে বাহিনী .. ব্লা ব্লা ব্লা..
এতো বকবক কে শোনে?

রাস্তা- ঘাটে চলতে পারি না এক দিকে আবর্জনা অন্যদিকে চোর-ডাকাত-বাটপার- ভিক্ষুক-হিজড়া,ছিনতাইকারী – ফাজিল লোক-

শুরু হয় বকবকানী…

আচ্ছা কঞ্চাই – কেমন করে এ দেশের মানুষের মনটাকে পালটে দেয়া যায়?

রুনুর মায়ের এসব অযাচিত বাতচিতে রুনুর বাপে কাহিল!
গামছা পরে কলের পাড়ে স্নানের আয়োজন করছে রুনুর বাপ। প্রত্যাশা করছে রুনুর মা কল চেপে দেবে। রুনুর মায়ের কল চাপতে সমস্যা নেই কিন্তু ওই বকবকানী শুনতেই হবে।
রুনুর বাপে কোন চিল্লাপাল্লা না করে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে,হাতে আমপাতার মিসোয়াক।

রুনুর মায়ে রাষ্ট্র চিন্তা বাদ দিয়ে এবার শুরু করেছে-আমনের মাথা খারাপ অই গেছে। আমপাতার গায়ের ওপর পোকা-জোকা হাঁটে নাই। এই মুখ লই খালি কাছে আইয়েন! পুড়েই তবে জার্মমুক্ত করুম!

– হে,কী কতা রে! কুলি না করেই কিন্তুক আইতাছি!
– এক টানে লুঙ্গি কিন্ত খুলি হালামু! ধরেন ব্রাশ নেন!
আমনে আর এ দেশের মাইনষের ভিত্তে কোন তফাৎ নেই!
খবিশ!

রুনুর বাপে ব্রাশ হাতে নিতে নিতে বলে, পাগলী, কেন্নে তফাৎ অইবো! আঁই তো মানুষই, তাই না?

রুনুর মা, বালতি ভরিয়ে দিয়ে চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই রুনুর বাপে হাত ধরে টান দিয়ে বললো, যাস কই?
তুই না থাইকলে স্নান হবে? পিঠ ডলি দেয়।

রুনুর মা চোখে মোছে আর পিঠ মাজে। কিছুক্ষণ পর আবার শুরু হয় বকবকানি।

তামাশা দেখলেন, রমজানে প্রাইমারি স্কুল ছুটি আছিলো। মাস্টারেগো শান্তিতে রোজা রাখার সুবিধা অইছিলো। এখন আবার দশ শনিবার স্কুল খোলা রাইখছে। কঞ্চাই, শনিবারে রুনুরে কে স্কুলে লই যাইবো? শুক্র-শনি রুনুর স্কুল বন্ধ বলেই না আঁই কাম লইছি। নইলে আমনে একা একা সংসার কেমনে চালাইবেন?

তা ছাড়া মাস্টারেগো দুইদিন ছুটি বইলা কত প্ল্যান প্রোগ্রাম করি রাখে। এখন তো মাস্টারেরাও বিরক্ত অইবো, অভিভাবকেরাও ত্যাক্ত অইবো। শিখনের ঘাটতি বলে কিছু আছে,কন তো?

মানুষ স্কুলে গেলেও শিখে না গেলেও শিখে, হাছা কইছি না?
রুনুর বাপে হাসবে নাকী কাঁন্না করবে?

দে দে গামছা দে,পিঠ মাজার গোষ্ঠি কিলাই! তোর এই বকবকানী আর নিতে হারিয়েন না!

দে মাথায় পানি দে। আল্লাহ এ কোন জ্বালা!

রুনুর মা এক মুহূর্ত চুপ করে। আবার শুরু করে।
দেন পানি ঢালি,তাও যদি আমনের মাতা খোলে!
এতো ঢিলা মানুষ কেমনে হয়?

আঁই হুনি না,মাস্টারেরা যে কয়, হেতাগো বেতন কম, তাইলে হেতাগো ছুটিও ক্যান্সেল কেন করে? এইটা তো জুলুম।আল্লাহ তো জুলুম কইরতে নিষেধ কইচ্ছে।

মন্ত্রী কইছে স্কুলে ভর্তি অইতে পরীক্ষা দিতে অইবো। আঁই তো বেক্কল অই গেলাম! চার বছরের বাচ্চা পরীক্ষা দি নি স্কুলে ভর্তি অইবো? তুঘলকী কান্ড! অইতে হারে আই এ, বি এ তে ভর্তি পরীক্ষা, হিয়ারলাই, প্রি-মাইমারিতেও! আজাইরা মানুষ মারার কল! মানুষ কী ওন্দুরনি? আইজ ৫৫ তম স্বাধীনতা দিবস। কজন মাইনষে জানে এই দিনের গুরুত্ব! তাইলে কিয়ের লেখাপড়া অইচ্ছে, বলেন। কতা কন না কেনে?

ওরে আল্লাহ! আমারে দুনিয়া থেকে তুলে নাও,সকল সমস্যা তারই সমাধান করতে হবে! (রাগ হলে রুনুর বাপে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে!)

রুনুর মা বুঝলো রুনুর বাপে রাগ হয়েছে। এবার নিজেই চোখ কপালে তুলে চেয়ে আছে। তারপর বলে কেউ এ দেশটারে ভালোবাসে না! বলেই কলের পাড় থেকে চলে আসে।

রুনুর পুতুলের বিয়ে দিয়ে শেষ। মিছেমিছি বিরানী রান্না করে
মায়ের মুখের কাছে ধরে। বলে মা, খাও। পুতুল শ্বশুরবাড়ি যাবে,আমিও যাবো।

রুনুর মা, রুনুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, শোনো মা, পুতুল যাক শ্বশুর বাড়ি। তুমি যাইও না। মেলা লেখাপড়া করে শিক্ষামন্ত্রী অইতো অইবো। মানুষকে শিখাইতে অইবো – জুলুম করা যাইবো না।

রুনুর বাপে চুল মুছতে মুছতে এসে পেছনে দাঁড়ায়।
এবার মেয়েটিরও মাথা শেষ করবে!

আমার লগে শুদ্ধ কতা কইতেছেন? আঁইও হারি কইলাম!
রুনুর বাপে হাসে,ইসস! দেশ উদ্ধারকারী!
রুনুর মা ঘুরে দাঁড়ায়। খুব শীতল চোখে রুনুর বাপের চোখের দিকে তাকায়! কঠিন করে বলে আচ্ছা!

ঠিক তখনই পুলিশ এসেছে বাড়িতে। তকি উল্লাহ আছেন?
আপনার পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনে এসেছি।

রুনুর মা সুন্দর করে চা নাস্তা দেয়। পুলিশ তো ওঠে না! রুনুর বাপে রুনুর মাকে বলে টাকা কিছু দেয়া লাগবে নইলে ওই বেটা যাইতো নয়।

রুনুর মা সোজা পুলিশের সামনে দাঁড়ায়, ভাই, আমনের কী তথ্য নেয়া শেষ?

পুলিশ ঘাড় নাড়ে শেষ।
তাহলে আপনি এবার যাইতে হারেন। আমরা ভাত খামু।
আর যদি ভাত খান তাইলে বইয়েন, নাইল্লার হাগ রাইনছি।
লগে পোড়া মরিচ। আমনে খাইতে চাইলে আন্ডা ভাজি দিমু!
কাচুমাচু পুলিশ বার বার এদিক ওদিক তাকায়. তকি উল্লাহ সাহেব কোথায়?

হেতারে শূলে ছড়াইছি। হেতে কামাই কইরতা হারেনা। খালি খরচ বাড়ায়। আমনে যাইবেন না খাইবেন?

হুনেন,পাসপোর্টর কোন তথ্য ভুল হাইছেন?

-না।

আর কিছু কইবেন? মাইনষে কয় পুলিশে টাকা খায়। কতা ইয়ান হাছানি?

– না, না৷ গাড়ি ভাড়া দেয় আর কী!

সরকার আমনেরে গাড়ি ভাড়া দেয় নাই?

শুরু করলো বকবকানি! বেচারা পুলিশ নাজেহাল!

আঁই এসপি রে ফোন দিমু, দিতামনি?

না না। আমি চলে যাচ্ছি।

যদি রিপোর্ট উল্টা-পাল্টা দেন, আপনে রুনুর মারে চিনেন না!

রুনুর বাপে ধীর পায়ে রুনুর মায়ের পাশে দাঁড়ায়।
হাত দুটো ধরে বলে, তুই রুনুরে ভালো ভাবে মানুষ কর। এ দেশ ঠিক করণের কাজ তোর নয়। এ দেশের প্রতিটি মানুষই জটিল! পাগল হয়ে যাবি রে বউ!

রুনুর মা হুহু করে কাঁদে, মুখ লুকায় রুনুর বাবার বিশাল লোমশ বুকে। আমাদের দেশ কেন গরীব দেশ?

শাহানা সিরাজী
শিক্ষক, কবি, প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন।

যখন আমায় ডাকলে তুমি – শাহানা সিরাজী

আরও সংবাদ পড়ুন।

প্রান্তিক সকাল – শাহানা সিরাজী

আরও পড়ুন।

ভিক্ষুক – শাহানা সিরাজী

আরও পড়ুন।

এক পলক – শাহানা সিরাজী

আরও পড়ুন।

এক পলক – শাহানা সিরাজী

আরও পড়ুন।

শেকড় – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

পৃথিবী জেগে থাকো – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

অশিক্ষা -কুশিক্ষা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

ভিক্ষুক – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

ও আমার দেশ: তারা কোথায়? – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

শূয়র – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

অচল ঢাকা – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

অশিক্ষা -কুশিক্ষা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

ভিক্ষুক – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

বাংলাদেশ – শাহানা সিরাজী

আরও লেখা পড়ুন।

রমজান একটা গাঁজাখোর – শাহানা সিরাজী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top