গুলিস্তান ও আব্বা – শাহানা সিরাজী

Picsart_23-10-22_23-34-56-907.jpg
admin

সকালে যখন অফিসে যাচ্ছিলাম আব্বা শুয়ে আছেন। তার আগে একসাথে নাস্তা করলাম। আব্বা বাড়ি নিয়ে বিশেষ চিন্তিত। আব্বার ধারণা তাঁর অনুপস্থিতিতে বাড়ির অন্য লোকেরা আবার সম্পদ দখল করবে। এই নিয়ে আব্বার ভাবনার শেষ নেই।

বললাম জায়গা জমিতো পড়েই আছে, বাড়ির লোকেরা খাক, অসুবিধা কি? আব্বা বললেন খেলে অসুবিধা নেই কিন্তু তারা দখল করবে। এই জমির পেছনে আমার অনেক কষ্ট অনেক খাম ঝরেছে।

আব্বাকে বললাম, দলিল আমাদের জমিও আমাদের। আব্বা বললেন, একবার দখল করলে তাদের তুলে দেয়া মুশকিল হবে। বাড়িতে একটা ঘর করা খুব প্রয়োজন। আমি হাসতে হাসতে বললাম,আচ্ছা আব্বা বাড়িতে ঘর করব। এখন অফিস যাব।

আব্বা বললেন, আজ একটু দ্রুত ফিরে এসো, আমার জন্য শরীরটা ভালো লাগছে না। আমি গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বর নেই, সর্দি -কাশি কিছুই নেই। আমার আব্বা খুবই শক্তিশালী মানুষ। বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ছাড়া আর কোন রোগ নেই। আব্বাকে বললাম আপনি বিশ্রাম করুন আমি অফিস থেকে ফিরে এসে আপনার সাথে আবার কথা বলব। আব্বা বললেন,যাও। আল্লাহাফেজ। তোমাকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম।

আমি চলে গেলাম অফিসে আবার অফিস আমার বাসা থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে। ত্রিশ কিলোমিটার কোন দূরত্ব নয় যদি রাস্তাঘাট ভালো থাকে। আমাদের দেশে তো রাস্তাঘাট যেন
জাহান্নামের দরজা! অবশ্য জাহান্নামের দরজা কেমন দেখিনি কখনো কিন্তু আমার অফিসের রাস্তা দেখেছি, ত্রিশ কিলোমিটার যেন তিনশ কিলোমিটার!যাওয়ার সময় একটু কম দেড়শ কিলোমিটার!আসার সময় পুরোপুরি তিনশ কিলোমিটার!ফলে আসা-যাওয়ার কষ্ট অনেক, সময় লাগে অনেক। তবুও বাসা থেকেই যাই কারণ নিজের বাসাটি আবাদ থাকে। বাবা মাকে দেখাশোনা করতে পারি। সন্তানদের দেখাশুনা করতে পারি। ভালো লাগে। কষ্টটুকু কে কষ্টই মনে হয় না যখন ফিরে এসে পরিবারের সাথে থাকি।

আজও তেমনি অফিসে গেলাম। আমি তখন ক্লাসে হঠাৎ আবার মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলো। আমি অবাক হলাম এ সময় ফোন বাজার কথা নয় কারণ সবাই জানে এই সময় আমি ক্লাসে থাকি অথবা অফিসে অন্য কোন কাজে ব্যস্ত থাকি। এই ফোনটি আম্মার। কারণ আম্মাকে শিখিয়েছি যখন আমি ক্লাসে থাকবো তখন ফোন না করে একটি ভয়েস এসএমএস পাঠাবেন। এসএমএসের রিংটোন আমি সেট করে রেখেছি। সুতরাং সহজ হিসাব আম্মাই ফোন করেছেন। আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আম্মা কেন ফোন করলেন! স্টপ হয়ে গেলাম। সবাইকে স্যরি বললাম কারন এই ফোনটি ধরতেই হবে। ইমার্জেন্সি না হলে আম্মা ভয়েস এস এম এস পাঠাতেন না। আম্মা এসএমএস পাঠালেন তোমার আব্বা খুব ঘাম ছিলেন, আমি ঘাম মুছে দিয়েছি কিন্তু তোমার আব্বা কথা বলছেন না। দ্রুত বাসায় ফিরে আসো। আব্বার কি হয়েছে নিজেকেই প্রশ্ন করলাম এবং ক্লাসটি আমার একজন সহকর্মীকে দিয়ে আমি বসের কাছে গেলাম ছুটি চাওয়ার জন্য। কিন্তু বস ফোনে কথা বলছেন তো বলছেনই। হয়তো জরুরী কথাই। পাঁচ মিনিট গেল দশ মিনিট গেল পনের মিনিট গেল, পুরো আধা ঘন্টা আমি দাঁড়িয়ে রইলাম এবং কান্না করছিলাম। বস আমাকে দরজায় দাঁড়াতে দেখে রিভলভিং চেয়ার ঘুরিয়ে নিয়ে কথ বলেই যাচ্ছেন। আমি কী উনার কথার ভেতরই হস্তক্ষেপ করবো? নাকি অনুমতি না নিয়েই চলে যাবো। এসব ভাবছি আর অপেক্ষা করছি। একটা সময় তিনি জোরে হেসে উঠে বললেন, ওকে প্রিয়তমা, আজ রাতে এক সাথে খাবো। তার মানে ফিল্ডিং মারছেন! মারুকগে! আমার বাসায় ফিরতে হবে। বললাম, স্যার, আম্মা ফোন করেছেন,আব্বা আসুস্থ হয়ে পড়েছেন, বাসায় যাওয়া দরকার। তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন। আসলেনই তো এক ঘন্টা হয়নি। এসেই যাবার কথা কেন বলছেন? আপনি তো ক্লাসে থাকার কথা। জ্বী স্যার, ক্লাসেই ছিলাম, মহুয়া ম্যাডামকে ক্লাসটি ট্রান্সফার করে দিয়েছি। আব্বা সকালেই বলছিলেন, শরীর খারাপ করছে,, এখম আম্মা ফোন দিলেন।

তিনি নড়ে চড়ে বসে এমন ভাবে তাকালেন,যেন আমি মহা অপরাধী,এখনই গ্রেফতার করে জেলে পাঠাবেন! আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। কাগজ একটি এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটা টাইপ করে দিয়ে যান। জানেন তো আমি এসব পারি না।

কোন কথা না বলে কাগজটি টেনে তিন মিনিটে টাইপ করে উনাকে মেইল করে সোজা বাসে উঠলাম। কারণ টেম্পার ফেইল। এবার কষে চড় বসিয়ে দিতে পারি। অথবা অন্য কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারচেয়ে না বলেই যাই। বাকি যা হবার তাই হবে। শুনেছি সেদিন নাকি চিল্লায়ে প্যান্ট খারাপ করে দিয়েছে!

এতো রিস্ক নিয়ে বেরিয়ে আসলাম যে আব্বার জন্য সে আব্বার কথা যেন ভাবারই সময় পাচ্ছি না। আম্মা আবার ফোন দিলেন, তোমার আব্বা কথা বলছেন না।

আম্মাকে বললাম, বুকের কাছে কান নিয়ে শুনুন তো ধুকপুক ধুকপুক শব্দ করে কি না?

আম্মা জানালেন,তিনি বুঝতে পারছেন না। বাসায় কেউ নেই। আম্মাকে বললাম, হাসপাতালে নিতে পারবেন? আমি এম্বুল্যান্স ডেকে দিই? আম্মা বললেন, কিছুই লাগবে না তুমি আসো। আমি চাইলেই তো দ্রুত আসতে পারবো না। এ রাস্তায় হাজার হাজার গাড়ি, পুরো রাস্তা ব্লক। আমার তো ব্যক্তিগত গাড়িও নেই পাবলিক গাড়িতেই আসতে হচ্ছে।

আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে গুলিস্তান এলাম।

হায়! হায়! এখানে করুণ অবস্থা! চারদিক থেকে শুধু গাড়ি বন্ধ করেনি মানুষের চলাচলও বন্ধ করেছে। কাউকে হাঁটতে দেখলেই পুলিশ তেড়ে আসছে, বন্দুক বের করছে।

এমতাবস্থায় আমাকে গাড়িতেই বসে থাকতে হলো! গাড়িতে বসেই রইলাম তিন ঘন্টা।

আব্বা কেমন আছেন? তিনি কী বেঁচে আছেন? ফুয়াদের আম্মা ট্রেনিং করতে গিয়েছে চেন্নাই। সাথে নিয়ে গেলো আমাদের সন্তানদেরকেও। মিলিকে জানাবো কিনা। অবশেষে তাকে জানালাম। আব্বার কন্ডিশন। মিলি কাঁদতে কাঁদতে বললো,সবাইকে জানাও।আব্বা পাসড এওয়ে। কী! আব্বা নেই!আমি কাঁদতে লাগলাম। মিলি সাথে সাথেই ট্রেনিং থেকে বেরিয়ে ফিরতি টিকেট কাটলো। এবং উড়াল দিলো। আমি পৌঁছানোর আগেই মিলি এয়ারপোর্টে চলে এলো। তারপর একই রকম ভাবে সেও রাস্তায় আটকা পড়লো। ভাই বোন পাঁচজন। সবাই ঢাকা। কিন্তু কেউই পৌঁছাতে পারছি না!

জানতে চাইলাম কেন সব কিছুকেই স্টপ করে রেখেছে? একজন বলল ভি আই পি আসছে। মেজাজটা আবারো খারাপ হয়ে গেল! তুমি কে ভি আই পি? তোমার জন্য এই রাস্তা ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকে, তুমি ফ্রি রাস্তায় চলাচল করবে আর এই দেশের আমজনতা মানুষ ভেঙ্গে ভেঙ্গে গাড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে পিঁপড়ার মত রাস্তায় চলবে, তা কি করে হয়? এই কী দেশ নাকি দেশ নামের লুটের মাল!

কেন ভি আই পিকেই শুধু প্রটোকল দেবে? আমরা আম জনতা আমাদের ফ্রি রাস্তায় চলার কোন অধিকার নেই? তুমি এমন কি কর বাপু,তোমার জন্য রাস্তা বন্ধ, আগে পাছে এতো গাড়ি,পুলিশ প্রহরা! এতো সব কেন লাগে?
প্রকৃত নেতার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জানা অজানা সকল মানুষ ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, নিজেরাই পথ দেখি এগিয়ে নেবে। এ কেমন ভি আই পি যার জন্য লাখ লাখ মানুষ ভোগান্তিতে থাকবে!

আমার আব্বা মারা গেলো নাকি বেঁচে আছে, কাঁদবো? ডাক্তার ডাকবো?

নেমে হাঁটবো তার উপায় নেই, ধরে জেলে ঢুকিয়ে দেবে। আবার আম্মার ফোন বেজে উঠলো, আম্মা আব্বা কথা বলছেন?

আম্মা বললেন,তোমার পথ এতো দীর্ঘ কেন হলো? এখনো কেন আসো না?

বললাম, আম্মা ভি আই পি আসবে তাই তিনঘন্টা ধরে গাড়ি বন্ধ। এমনি লোকদেরকে হাঁটতেও দিচ্ছে না। আম্মা বললেন, সাবধানে থেকো। আমি আছি।

এবার সাহস করে নামলাম, পুলিশকে বললাম, ভাই আব্বা মনে হয় নেই,আমাকে যেতে দিন।

বেচারা মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবল, হয়তো তার বাবার কথাই মনে পড়ছে। সে আমাকে হাত ধরে পুরো ট্রাফিক পার করে বললো, সামনে হাঁটূন।

আমি হাঁটতে পারছি না। পা চলে না। গলিতে ঢুকে রিকশা খুঁজলাম। পেলাম না। এ গলি ও গলি অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে চলছি। তারপর পথ পেলাম। হাতিরপুল, যেখানেও জ্যাম, যাই হোক দোকান ধরে ধরে হেঁটে আসছি, আর ভাবছি আব্বা কেমন আছেন? আম্মা একা একা আব্বার সাথে কী ভাবে বসে আছেন? ছুটতে ছুটতে বাসায় এলাম। তখন সন্ধ্যা ছয়টা। আমরা তিনভাই পৌঁছলাম। বোনেরা এখনো আসেনি। মিলি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েছে কিন্তু এখনো পৌঁছায়নি।

কলিং বেল বাজালাম। বড়ভাই দরজা খুলে দিলেন। আম্মা কোরান পড়ছেন আব্বার পাশে বসে। আম্মা কম্বল দিয়ে আব্বাকে ঢেকে রেখেন। আমি কম্বল তুলে আব্বাকে দেখেই দিশাহারা হয়ে গেলাম। আব্বার মুখ থেকে লালা ঝরছে। তাহলে আব্বা সেই সকালেই পরপারে চলে গেছেন? দুনিয়ার সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। আমাকে সকালেই আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেছেন, জমি জমার বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে কী আব্বা জানতেন আজই আব্বার বিদায়ের পালা!

বড় আপরাধী লাগলো। যদি আর একটু সময় আব্বার সাথে কথা বলতাম!

আমি ছেলে মানুষ বলে কী আমার প্রাণ নেই?
যদি অফিস থেকে আম্মার ফোন পাওয়ার পর বের হতে পারতাম তাহলে হয়তো ভি আই পির ছোবলে পড়তাম না।
আম্মা বললেন, আমাকে যখন ফোন দিয়েছিলেন তখন আব্বার বুক ওঠা নামা করছিলো। তারপর ধীরে ধীরে থেমে গেছে। আম্মার চোখের সামনে আব্বা বিনা চিকিৎসায় চিরবিদায় নিয়েছেন। হায় রে ভি আই পি!

আব্বার পায়ের কাছে বসে আছি। মিলিও ভি আই পির খপ্পরে পড়েছে। রাত আটটায় এসে পৌঁছালো। আমার ছেলে মেয়ে দাদাকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে কান্নাকাটি করছে। বোনেরাও এসেছে। সবারই একই অবস্থা। আজ বিশেষ কোনদিন তাই মন্ত্রীসভার সকলেই রাস্তায় নেমেছে। আর পথচারী খেটে খাওয়া মানুষদের পেটে লাত্থি পড়েছে।
আজ কতজনের বাবা মা,আপনজন এ ভাবে মরে নিথর পড়েছিলো তার হিসাব ভি আই পিদের কাছে নেই।

মন চাচ্ছে অফিসে ফোন করি। বসকে দুটো কথা শোনাই। পরে থেমে গেলাম। মানুষের ভেতর জন্মগত অহংকার আছে। সে অহংকার এপ্লাই করে সাবঅর্ডিনেটদের উপর। এখান থেকে বের হতে পারা খুবই কঠিন। হয়তো আব্বাকেও অসম্মান করে কথা বলতে পারে!

তাই থেমে গেলাম। আমি থেমে গেলেও ফোন থামেনি। অফিস থেকেই বস ফোন দিয়ে না বলে কেন চলে এলাম তার জন্য ওয়াশ দিচ্ছিল, কিছু সময় শোনার পর বললাম,আব্বাকে দাফন করে না হয় আপনার বাকী বকা শুনি!


শাহানা সিরাজী।
কবি প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক।

আরও সংবাদ পড়ুন।

মিউজিয়াম অব সায়েন্স,দারুণ এক অভিজ্ঞতা – শাহানা সিরাজী

আরও সংবাদ পড়ুন।

বাংলাদেশ – শাহানা সিরাজী

আরও সংবাদ পড়ুন।

ঘুরে এলাম বস্টন হারবার দ্য নিউ ইংল্যান্ড একুরিয়াম – শাহানা সিরাজী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top