চুক্তি থেকে কবে মুক্তি মিলবে পাঞ্জেরী? ক্ষোভ, দুঃখ ও কষ্টে চাপা পড়েছে জনপ্রশাসন!

Picsart_22-10-26_15-39-52-328.jpg

বাংলাদেশের কোটি বেকারের স্বপ্ন একটি সরকারি চাকুরী। শুধু স্বপ্ন পুরন হলেই হবে না হতে হবে বিসিএস কর্মকর্তা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দেবার সাথে সাথেই যে কোন কর্মকর্তার মনের ভেতর একটি সুপ্ত বাসনা জম্ম নেয়, সর্বচ্চ শিখরে উঠতে হবে! অথবা আমাকে সচিব বা সিনিয়র সচিব হতে হবে। বলতে পারেন, এটি পাপ নয় বরং একটি স্বপ্ন। আর এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রশাসনের একেক জন সদস্যকে প্রস্তুত হতে হয়। রাগ, ক্ষোভ, লজ্জা, হিংসা, ভয় এড়িয়ে সরকারের দায়িত্ব পালনে নিজেকে কঠোর থেকে কঠোরতম ভাবে প্রস্তত করতে হয়। এখানে নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বাস রাখতে হয়।

এই নশ্বর পৃথিবীতে যে মানুষের চাহিদা বা লোভ না আছে তিনি মানুষই নন। সেই সব সততার মোড়কে নিজেকে বেঁধে স্বপ্ন পূরনের কর্দমাক্ত রাস্তায় হেটে যেতে হয়। কিন্তু মাঝপথে বা মগডালে বসা সিনিয়রগণ পদ বা চেয়ার ধরে বসে থাকেন কিন্তু পদ বা চেয়ার কোনটাই ছাড়েন না।

তাহলে স্বপ্ন?

এসব সিনিয়রগণ কর্মের দোহাই দিয়ে, রাষ্ট্রের দোহাই দিয়ে প্রতিবার অধস্তন কর্মকর্তাদের স্বপ্নগুলোকে ছাইচাপা দেন। মনের কষ্টগুলোকে দুঃখে রুপান্তরিত করেন।

আপনাদের মত সিনিয়র কর্মকর্তাদের সামনে যখন এসব বঞ্চিত কর্মকর্তাগন দাঁড়ান তখন জুনিয়র কর্মকর্তাদের দীর্ঘশ্বাস আপনারা শুনতে পান? যদি আপনার জুনিয়র সহকর্মীর মনের দীর্ঘশ্বাসই শুনতে না পান, তাহলে রাষ্ট্রের মালিক তথা জনগণের মনের কথা, কষ্টের কথা আপনারা কিভাবে শুনবেন?

সম্প্রতি আরও একজন সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। সরকার একজন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতেই পারেন। আইনেই চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগের বিধান রয়েছে।

উদাহরণ হিসাবে রেলওয়ের সচিব ড. মোঃ হুমায়ুন কবীরের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগামী ২০ ফেব্রুয়ারিতে।

কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকার বাহাদুর তাকে এক বছরের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। সচিব হিসেবে ড. মোঃ হুমায়ুন কবীর নিয়োগ পেয়েছেন। তার ও তার পরিবারে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আমি নিজেও আনন্দিত হয়েছি। কিন্তু সরকার বাহাদুর ড. মোঃ হুমায়ুন কবীর কি এমন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন? কি এমন যাদুর কাঠি দেখিয়েছেন যে, তিনি আরও এক বছরের জন্য চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ পেলেন?

বিভিন্ন পত্র – পত্রিকায় ছাপানো সংবাদ ও তথ্য সন্নিবেশ করে দেখা যায়, সরকারের মোট সচিবদের প্রায় অর্ধেকই এখন চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ লাভ করেছেন। যা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

প্রিয় সিনিয়রগণ, আপনারা কি জানেন এসব ঘটনাগুলো নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে হাসাহাসি হয়! সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোতে টেবিল আলোচনার অংশ হয়। সচিবালয়ে ও সচিবালয়ের বাহিরে কর্মকর্তারদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করে। চাকরি হারানোর ভয়ে বা ওএসডি হবার ভয়ে মুখ খুলতে না পারা জুনিয়র কর্মকর্তাদের ভেতরে তোলপাড় হয়।জুনিয়র কর্মকর্তাদের বুকের ভেতর রক্ত ক্ষরন হয়। জুনিয়রদের চোখের জলে পদ্মা, মেঘনায় বন্যা হয়!

আসলে আপনারা ভালো করেই জানেন। আপনারা বইপড়া মানুষ, আইন মেনে চলা মানুষ, আপনারা এই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মানুষ।

একজন সিনিয়র কর্মকর্তা চুক্তিতে নিয়োগ পেলে অন্তত এক ডজন জুনিয়র কর্মকর্তার পদোন্নতির রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। ডজন, ডজন কর্মকর্তার মনে কষ্ট জমে, দুঃখ জমে। এক কর্মকর্তার মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে কত জনের স্বপ্নের ঘর ভাংচুর হয়। কত জনের চোখের নোনা জলে বালিশ ভিজে! জানেন, খোঁজ রাখেন?

আমি বলছি না, যিনি চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ পেলেন তিনি অযোগ্য! আমি বলছি, যারা জুনিয়র হিসাবে আছেন, তারা কি অযোগ্য ?

নিয়োগ দেওয়া যেমন সরকার বাহাদুরের দায়িত্ব ও কর্তব্য তেমনি প্রমোশন দেওয়াও সরকার বাহাদুরের দায়িত্ব ও কর্তব্য। শৃঙ্খলা বজায় রাখতেও ন্যায় বিচার ও সঠিক সময়ে প্রমোশন প্রয়োজন।

ফেরা যাক কারা সচিব হওয়ার স্বপ্নে নির্ঘুম রাত পার করছেন। ১৫তম ব্যাচ সচিব হওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষায় আছে।

১৫তম ব্যাচ ছাড়াও অনেকগুলো ব্যাচ আছে যারা এখনও পর্যন্ত পদোন্নতির অপেক্ষায় স্বপ্ন বুনে যাচ্ছেন।

উদাহরণ হিসাবে ১০, ১১ এবং ১৩ ব্যাচের অনেক যোগ্য, কর্মঠ, দায়িত্ববান কর্মকর্তা আছেন। যাদের সততা প্রশ্নাতীত! চাকরি জীবনে তাদের সফলতা ইর্শনীয়! পরিস্কার ও পরিছন্ন ব্যাক্তি ও পারিবারিক জীবন। তারা তো সরকার বাহাদুরের মুখের দিকে তীর্থের কাকের মত তাকিয়ে রয়েছে সচিব হওয়ার অপেক্ষায়।

সরকার বাহাদুর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলেন, তাহলে এই তীর্থের কাকের মত তাকিয়ে থাকা কর্মকর্তারা কি বাংলাদেশের সন্তান নয়? তারা কি আপনার কাছে প্রাপ্যটুকু পেতে পারেন না?

সরকার বাহাদুর, বঙ্গবন্ধু’র সোনার বাংলা গড়তে আপনি কি সিন্ধান্ত নিলেন? চুক্তি ভিত্তিক!

চলমান সময়ের প্রশাসনের শীর্ষ সব কর্মকর্তাগণই চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ লাভ করেছেন। বিষয়টি সত্যি দৃষ্টিকটু!
জনপ্রশাসনের ভেতরে বাহিরে নানান ঘটনা রটনা হয়ে রটে।

সরকার বাহাদুরের এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে ইট চাপা চাপা পড়ে বিবর্ন হয়ে আছে জনপ্রশাসন। জাতীয় প্রেসক্লাবে আড্ডার ছলে অনেক সিনিয়রই বলেন, বুড়ো ঘোড়া নিয়ে মাঠে নামা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? ডজন ডজন চুক্তির ভারে জনপ্রশাসন এখন ঠিকমত চলতে ফিরতে পারছে না। 

উদাহরণ হিসাবে আমি উল্লেখ করছি।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আখতার হোসেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বা এনবিআরের চেয়ারম্যান আবু হেনা মোঃ রহমাতুল মুনিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্বাহী চেয়ারম্যান সিনিয়র সচিব শেখ ইউসুফ হারুন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিয়া, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব গোলাম মোঃ হাসিবুল আলম, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আব্দুস সালাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফিজুর রহমান, রাষ্ট্রপতির সচিব সম্পদ বড়ুয়া, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সংযুক্ত ওয়াহিদুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সচিব মোকাম্মেল হোসেন, ইরাকে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল বারী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, গৃহায়ন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সচিব পদমর্যাদায় আছেন মো. আনিসুর রহমান মিয়া। 

এছাড়াও এডিবির বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ফাতেমা ইয়াসমিন এবং বিশ্ব ব্যাংক ওয়াশিংটন থেকে সদ্য পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী সাবেক মূখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস এখন চুক্তির তালিকায় রয়েছেন। কারণ, ড. কায়কাউসের পদত্যাগপত্র বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ডসভায় এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদিত হয়নি। 

এদিকে,গত ১২ জানুয়ারি থেকে ১১ জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত মোট এক বছর ছয় মাস মেয়াদে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ভূতাপেক্ষভাবে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা দেওয়া হলো।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বিসিএস অষ্টম ব্যাচের কর্মকর্তা।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব নেন।

সারাদেশের সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবদের অর্ধেকই চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ লাভ করেছেন। জনপ্রশাসন সার্ভিস থেকে বেছে নেওয়া দক্ষ, কর্মঠ, মেধাবী কমকর্তারা দিনের পর দিন চোখের জল ফেলছেন। এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জোয়ারে আমার মেধাবী কমকর্তারা পিছিয়ে পড়ছে।

এই পিছিয়ে পড়া কমকর্তাদের দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে।


সাগর চৌধুরী।
গণমাধ্যম কর্মী।
মুঠোফোন – ০১৯১২ ৭৫৪২৩২
email -sagarchawdhary1986@gmail.com

আরও সংবাদ পড়ুন।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন এবং সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত

আরও সংবাদ পড়ুন।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি শুভ সম্পাদক মহিউদ্দিন

আরও সংবাদ পড়ুন।

বিএফইউজে সভাপতি ওমর ফারুক, মহাসচিব দীপ আজাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top