পহেলা বৈশাখের একটুখানি সাহিত্য আড্ডা ১৪৩৩ – আমিনুল ইসলাম

Picsart_26-04-17_14-54-36-236.png
admin

মহাসমারোহে সম্রাটের বেশে ভোরে এসে দিনশেষে সন্ধ্যারাতেই চলে গেল ১লা বৈশাখ ১৪৩৩। দিনটি ছিল বাংলা নতুন বছরের ১ম দিন।

আমাদের চোখ খোলা ছিল সারাদিন এই কৌতূহলে যে কীভাবে বরিত হন সম্রাট নববর্ষ। সকালবেলা বাংলাদেশ টেলিভিশন সহ নানা টেলিভিশন চ্যানেলে টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিলাম বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। আমার জীবনে দেখা অন্যতম সেরা মানুষ আমারই জীবনসঙ্গী রোকশানা পারভীন লীনা। তাঁর পরামর্শে আমাদের মগবাজারের ফ্ল্যাটে বিকেলে আয়োজন করা হয়েছিল সাহিত্য আড্ডা। কবির ফ্ল্যাট আর কত বড়ো হবে! রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “এতটুকু বাসা”। অতএব সীমিত আড্ডার অংশগ্রহণের পরিসর। প্রবীণ গবেষক-লেখক-সাংবাদিক জাহাঙ্গীর সেলিম এবং সেলিম ভাবী, বিশিষ্ট কবি, বাচিকশিল্পী ও নকশিকাঁথা নামক লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক শাহ নাওয়াজ গামা, আশির দশকের শক্তিমান কবি প্রাবন্ধিক নূরুল হক, আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের রুমমেট এবং চাকরিতে ব্যাচমেট অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব গবেষক লেখক মুঃ আবদুল হাকিম মুকুল, বাচিকশিল্পী-গানের শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন পলি, আয়োজক রোকশানা পারভীন লীনা এবং তাঁর জীবনসঙ্গী কবি আমিনুল ইসলাম, আমাদের কন্যা সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রকৌশলী ডালিয়া নওশিন লুবনা এবং তার জীবনসঙ্গী সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার রাকিন আসিফ প্রীতম, আমাদের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার রাগিব ইশরাক সজন এবং আমাদের সন্তানসম গাড়িচালক রনি পহেলা বৈশাখের আনন্দ আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন।

লীনা তার সামর্থ্যমতো চা-কফি-ফলমূল-সেমাই-পায়েস-দই-ভুনা খিঁচুড়ি-সাদা ভাত–এসবের আয়োজন রেখেছিলেন। সবাই কোনো না কোনো ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আড্ডার সময় পরিসর ছিল বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা। মূল কথা বলার আগে সাহিত্য আড্ডআ সম্পর্কে একটু বলে নেয়া যায়।

সাহিত্য আড্ডা কেমন হতে পারে এবং কতটা প্রাণবন্ত হতে পারে তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সাহিত্য-সংগীতের আড্ডাগুলো। নজরুল ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ আড্ডাবাজ। আড্ডায় তিনি হতেন সূর্য আর অবশিষ্ট অংশগ্রহণকারীরা গ্রহ-উপগ্রহ ইত্যাদি। আর ‘ধূমকেতু’ অফিসের আড্ডাগুলো ছিল সেরা আড্ডা। এ প্রসঙ্গে নজরুল সাহচর্যধন্য খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন লিখেছেন:

“ধূমকেতু যেদিন প্রকাশিত হলো, কোলাকাতার কলেজ স্কোয়ারের মোড়ে দেখেছি সেদিন কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল। সারা দেশের মনের কথা টেনে বের করে নজরুল যেন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন কাগজের পাতায়, প্রতি ছত্রে।

অল্প সময়ের মধ্যে এমন জনপ্রিয় কবিও দেখা যায়নি, এমন জনপ্রিয় কাগজও। বাঙলাদেশে ‘ধূমকেতু’র আবির্ভাব অপ্রত্যাশিত, স্বল্পায়ু কিন্তু অবিস্মরণীয়। এর অফিস ছিল কোলাকাতা, মেডিকেল কলেজের পূর্বদিকে-৭নং প্রতাপ চাটুর্যে লেনে। সেখানে সন্ধ্যার পরে বসতো যতো ‘লক্ষ্মী ছাড়ার আড্ডা’। সেখানে কী যে হতো, আর কী হতো না, তা যাঁরা না দেখেছেন, তাঁদের বলে বোঝানো যাবে না।

ধূমকেতুর ধূমায়িত আস্তনায় সকল লক্ষ্মীছাড়ার মধ্যমণি হয়ে বসেছেন নজরুল। সে-কী উদ্দামতা, সে-কী প্রাণচাঞ্চল্য, সে-কী উচ্ছ্বসিত হাসির হুল্লোড়! সে হাসিতে ছাদের কড়িকাঠ বুঝি থর থর করে কাঁপতো। কাঁপতো দেয়াল, কাঁপতো পাশের বাড়ির নিরীহ মানুষগুলোর বুক।
গান গাইছেন নজরুল:

‘মোরা সব লক্ষ্মীছাড়ার দল।
মোরা সব লক্ষ্মীছাড়ার দল।’

চলছে পান-জর্দা আর চা খাওয়ার ছড়াছড়ি! একদিন তো তিনি বন্ধুদের সাথে বাজী ধরে নিজের উচ্ছৃঙ্খলতা আর উদ্দামতা প্রমাণের জন্য মেডিকেল কলেজের কোনো ছাত্রের কাছ থেকে চেয়ে আনলেন একটা মড়ার খুলি। আর খেয়ে ফেললেন তাতে করে চা!

এই আসরে নিয়মিত যেতেন জনাব মঈন-উদ্-দীন হোসায়ন, পবিত্র গাংগুলী, নৃপেন চ্যাটার্জী এবং আরো অনেকে। আমি মাত্র দু-একবার উপস্থিত ছিলাম নীরব দর্শক হিসেবে।

মড়ার খুলিতে চা খাওয়ার ঘটনা আমি নিজে দেখেনি। পরিচয় গাঢ় হওয়ার পর কবি আমাকে বলেছেন-স্পষ্ট মনে আছে।

‘ধূমকেতু’র আড্ডায় নজরুলকে দেখে মনে হতো, সারা শহরে এই একটি-ই যেন জীবন্ত মানুষ। এমন লা-পরোয়া মানুষ বুঝি আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।” (যুগস্রষ্টা নজরুল’, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন)

এবার আমাদের সাহিত্য আড্ডার কথায় ফিরে আসতে হয়। আড্ডার কোনো আনুষ্ঠানিক অগ্রিম সূচি থাকে না। আমাদের আড্ডারও কোনো আনুষ্ঠানিক সূচি ছিল না; কোনো সভাপ্রধান কিংবা প্রধান অতিথি ছিল না। কোনো নিয়ন্ত্রণকারীও ছিল না। আড্ডা শুরুতে অনেকটা ছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ এর মতো– “আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে হে সুন্দরী? / বল কোন পার ভিড়িবে তোমার সোনার তরী?” পৃথিবীর সব কথা একসাথে এসে হইচই শুরু করেছিল। সবাই রাজা! এক পর্যায়ে, কেউ বলেনি,–আমি নিজেই সঞ্চালক সেজে বসি। শুরু হয় কবিতা দিয়ে; অল্প অল্প বক্তব্য অথবা শানে নযুল অতঃপর কবিতাটি পাঠ। প্রথমেই কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা।

“তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ঐ নূতনের কেতন উড়ে কালবৈশাখীর ঝড়!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!”

উল্লেখ্য, ‘প্রলয়োল্লাস’ একটি বিখ্যাত গানও। কিন্তু “মনে করি অমনি সুরে গাই / কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।’ গাইবার শক্তি ছিল না তাই কবিতা হিসেবেই পাঠ করেছিলাম। দীর্ঘ কবিতাটি– পুরোটাই।

অতঃপর চিরসবুজ প্রাণের কবি নূরুল হক আবৃত্তি করে শোনান তাঁর স্বরচিত সনেট ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ’ । কবি নূরুল হক সনেট রচনায় সিদ্ধহস্ত। তিনি প্রচুর সংখ্যক মানসম্মত সনেট রচনা করেছেন। মুঃ আবদুল হাকিম মুকুল ধীর লয়ে ভরাট কণ্ঠে আবৃত্তি করেন জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’। মনে হচ্ছিল তিনি বনলতা সেনের বাড়িতে বসে তার মুখেঝামুখি কবিতাটি আওড়াচ্ছেন!এরপর কবি শাহ নাওয়াজ গামা তাঁর ভরাট ও সাবলীল উচ্চারণে একটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনান। তাঁর সেই কবিতার শিরোনাম ‘মহাযাত্রা’। তিনি একজন গুণী বাচিকশিল্পী, তাঁর পাঠ ছিল আবৃত্তির সমতুল্য। শাহ নাওয়াজ গামা ভাই একসময় নাটকে অভিনয় করতেন,– ছিলেন রাবির এসএম হলের নির্বাচিত নাট্য সম্পাদক। কবিতা রচনা, আবৃত্তি , সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা। এখন বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে। মাথায় এসে ভর করেছে পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণের ভাবনা। তাঁর এসময়ের কবিতার মধ্যে সেই আকুল জীবন-অনুভূতির ছাপ লক্ষ করা যায়। বয়সকালে এমন অনুভূতি সেখ সা’দী, রবীন্দ্রনাথ এবং আরও অনেক কবির মাঝেই বাসা বেঁধেছিল। তাঁর আবৃত্তি করা ‘মহাযাত্রা’ কবিতাটিও তেমন অনুভব ধারণ করেছে। কবিতাটির একটা অংশ:

“নির্লিপ্ত হই, মায়া ত্যাগ করি
পৃথিবীর উল্লাস রেখে বলি-
‘তৈরি আছি আমি শূন্য হাতে।
ফিরে যেতে চাই, সব খেলা সাঙ্গ করি
হাত বাড়ায়ে দাও-
ভ্রান্তিগুলো আমার আড়াল করে
সমাপ্ত করে দাও আমার এ মহাযাত্রা।”
[মহাযাত্রা, শাহ নাওয়াজ গামা]

আড্ডায় উপস্থিত শ্রদ্ধেয় জ্যেষ্ঠতম মানুষ– গবেষক জাহাঙ্গীর সেলিম আবৃত্তি করেন আমিনুল ইসলামের ‘বৈশাখী ভালোবাসা’ শিরোনামের একটি কবিতা। এই কবিতাটি তিনি বরাবরই খুব পছন্দ করে এসেছেন। আবৃত্তির সময় তাঁর উচ্চারণে ভালোবাসা ও দরদ উথলে উঠছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘বৈশাখী ভালোবাসা’ কবিতাটি নববর্ষ উপলক্ষে ২০১৮ সালে রচিত। আমি তখন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলাম। সচিব ছিলেন আমারই ব্যাচমেট নমিতা হালদার এবং বিএমইটির মহাপরিচালক ছিলেন সেলিম রেজা, তিনিও আমার ব্যাচমেট। নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল। আয়োজনের দায়িত্ব ছিল আমার উপর। সকালেই অনুষ্ঠান। আগের রাতে বসে প্রায় একটানে কবিতা লিখেছিলাম বাসায় বসে। কবিতাটিতে আমি চিরায়ত গ্রামপ্রকৃতি ও লোকায়ত সংস্কৃতির উপকরণ ইত্যাদির পাশাপাশি অফিসের কিছু দৃশ্যকল্প যোগ করেছিলাম। কারণ রাজধানী থেকে উপজেলা– সকল অফিস প্রাঙ্গণে নববর্ষ উদযাপিত হয়। সেই ব্যাপ্তিকে কবিতার চিত্রে ও চিত্রকল্পে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলাম। পুরো কবিতাটি একটু বড়ো আকৃতির। তবু নববর্ষের হাওয়ায় উছল ইন্টারনেট-পাঠক ও ফেসবুক বন্ধুদের জন্য কবিতাটি তুলে দিচ্ছি।

“তুমি তো জানো সুমনা, আমি এক পুরোনো পৃথিবী;
বহুবার বর্ষায় ভিজেছি, শুকিয়েছি শীতে,
ফাগুনে ফুটেছি, আর পুড়েছি খরায়,
এমনি করেই পার হয়ে এসেছি এতগুলো বছর
আজ এই এলপিআর-যৌবনে
আবারও নতুন করে জেগে উঠতে চাই,
সুমনা, তুমি কি আমার নববর্ষ হবে?

না সুমনা, এটা কোনো ভীমরতি নয়,
বলতে পারো— এ আমার অতৃপ্ত বাসনার পুনর্জন্ম!
ভালোবাসার ছন্দে পা ফেলে যদি আসো আমার
এই মাটিগন্ধী হৃদয়ে,
অর্থমন্ত্রীর ঘাটতি বাজেট কোনো বাধা হবে না,
ভালোবাসার রেমিট্যান্স আছে না !
তা দিয়ে তোমাকে বরণ করে নিতে স–ব করবো;
ফেলে আসা সময়ের মেলা থেকে খুঁজে আনবো
তালপাতার বাঁশি,
ভেঙে যেতে বসা চরবাগডাঙ্গার হাট থেকে কিনে
আনব নানা ডিজাইনের বাতাসা,
মহারাজপুরের হাটে ভবেশদার দোকানটা আজো আছে,
আছে আমবাগানের সেই ছায়াটিও,
সেখান থেকে কিনে নেব মচমচে তিলের খাজা,
একবার খেয়ে দেখো,
এসবের কাছে নস্যি–
ফ্রিজে রাখা যমুনা ফিউচার পার্কের আইসক্রিম
বলো সুমনা,– তুমি আসবো তো?

যদি আসো, শম্পার কাছে চেয়ে নেব পানের খিলি,
দেখবে, এমনভাবে রাঙবে তোমার ঠোঁট,
ল্যানকাম লিপিস্টিকের কোনো প্রয়োজন হবে না;
যদি আসো, রাবেয়া বসরী নেচে নেচে গাইবে লালনের গান
সাকিরার বেলিড্যান্স ভুলে গিয়ে
তুমিও হয়ে উঠবে হাততালি–ওয়ান মোর! ওয়ান মোর!

যদি আসো, এক সপ্তাহের ওয়ারান্টি দিতে পারি,
অফিস কোনো বাধা হবে না,
নমিতা হালদার যতই কাজ-পাগল হউক
আর আমাদের করে রাখুক—
টি-টুয়েন্টি ম্যাচের মতো টানটান,
বিএমইটির ডিজি জানেন, জানি আমিও,—
ভালোবাসার প্রতিও তার পক্ষপাত আছে,
চাওয়ার সাথে সাথেই মঞ্জুর করে দেবেন
ছুটি–যাও যাও, তোমরা ঘুরে আসো!

তো তুমি সবুজ শাড়ি, আমি লাল পাঞ্জাবি,
টিএসসি-জুটিদের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরা ঘুরব-
রমনা পার্ক থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান,
মাঝে আরও কত কী!
অতঃপর বিকেলে রাজউকের ক্রেনকে একপাশে রেখে
তুরাগ নদীর তীরে গিয়ে–
কাশবনে ওড়াবো ভালোবাসার ঘুড়ি।
লাল রোদ মাখা বাতাসের পিঠে চড়ে ভেসে আসবে
নজরুলের গান–
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখীর ঝড়!!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!’

আসবে সুমনা– আসবে তুমি-
বিরহের খরা দুপায়ে মাড়িয়ে-
সাথে নিয়ে ভালোবাসার এক বোশেখ ঝড়বৃষ্টি?”
[বৈশাখী ভালোবাসা]

আবৃত্তি ও কবিতাপাঠের মাঝখানে আবদুল হাকিম মুকুল কবিতার সঙ্গে ভালোবাসা, সমাজ ও প্রকৃতি সম্পর্ক বিষয়ে একটি নাতিদীর্ঘ কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও রসালো আলোচনা করেন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের তুখোড় ছাত্র ছিলেন। সাহিত্য, প্রকৃতি, সমাজ, প্রেম এসব বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞান খুবই সমদ্ধ এবং প্রাতিস্বিকতায় অনন্য। সকল বিষয়েই তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা ও অভিমত থাকে। অবশ্য গতকাল তার কাব্যালোচনা নরনারীর প্রেম বিশেষত পুরুষ কবিদের অতি নারীপ্রীতি নিয়ে রসে ও প্রজ্ঞায় এবং শারীরিক সৌন্দর্য ও যৌনতার ছুঁয়ে উপচে উঠছিল। সেটা সবাই খুব উপভোগ করেছিলেন। পুরুষ কবিরা কেন এত নারীপ্রেমিক ও নারীঘেঁষা হন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একসময় মনে হচ্ছিল বুঝি সিগমন্ড ফ্রয়েডকে ডেকে আনবেন! কিন্তু তাঁর জন্য সময়ের বরাদ্দ সীমিত ছিল। অতএব রক্ষা!

হাকিম মুকুলের রসালো আলোচনার পর সাবিনা ইয়াসমিন পলি তাঁর সুরেলা সপ্রাণ কণ্ঠে উচ্চারণ করেন জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটি। পলির সঙ্গে এই প্রথম দেখা আমার। আড্ডায় উপস্থিত অনেকের। তিনি ঢাকায় থাকেন। চাকরি করেন। কবিতাপাঠ ও গান করা তাঁর প্রিয় সখ বলে জানান। তিনি জাহাঙ্গীর সেলিম ভাইয়ের ভাগ্নি। তার মানে এখন থেকে আমারও ভাগ্নি। তাঁর আবৃত্তির কণ্ঠ চমৎকার। তিনি খুব সাবলীলভাবেই জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটি আবৃত্তি করে আমাদের মুগ্ধ করেন। কবিতাটি আমাদের বাংলাদেশের প্রকৃতি ও ভূগোলের-—মূলত দক্ষিণ বাংলা তথা বরিশাল অঞ্চলের প্রকৃতির দরদনিবিড় রূপায়ণ। এগুলো বাঙালির এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ। চোখের দেখা আর হৃদয়ের মুগ্ধ আকুলতা একাকার এই কবিতায়। নববর্ষে কবিতাটি বারবার পাঠ করা যায:

“আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে — এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়;
হয়তো বা হাঁস হবো — কিশোরীর ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,
সারাদিন কেটে যাবে কলমির গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে;
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ খেত ভালোবেসে
জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়;
হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেচাঁ ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙা বায়; — রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে।”
[আবার আসিব ফিরে, জীবনানন্দ দাশ]

সাবিনা পলির আবৃত্তির পর কবি শাহ নাওয়াজ গামা পাঠ করে শোনান আরেকটি স্বরচিত কবিতা ‘স্বর্ণলতা’ এবং নূরুল হক পাঠ করে শোনান তাঁর প্রেমের কবিতা ‘আমি মাধবীলতা, আপনি কে’। ‘আমি মাধবীলতা, আপনি কে’ অসাধারণ সুন্দর একটি কবিতা–আকুল আবেদনে যেমন হৃদয়ছোঁয়া, ছন্দে সাবলীলতায় তেমনি আবৃত্তিযোগ্য। মা, মাতৃভূমি, প্রেয়সী—একাকার সংশ্লেষে বাঁধা পড়েছে এ কবিতায়। কবিতাটির কয়েক লাইন এমন—

“ আপনি কে?
আমার ইচ্ছার একান্ত সরোবরে
কেবলি তোলেন ঢেউ, দুখের মর্মর
সহসা বিপন্ন হই আমি
অনন্তর বয়ে যায় সিডরের ঝড়।
সমুদ্রতল থেকে ধেয়ে আসে সুনামি।
আপনি শাসান বারবার
পৃথিবীর সব আগুনের চোখ এক করে
আমার দিকে যখন তাকান, ছারখার
হয়ে যায় সবকিছু, জ্বলেপুড়ে ভষ্ম হয়
বেদনা মথিত হৃদয়।
কে আপনি? আমার মা?
মাতভূমি? আমার জননী?
জানি শাসন আর সোহাগ পাশাপাশি চলে
আপনার সোহাগ নেই কেন?
কেন হবেন চোখের মণি?
সোহাগ লুকিয়ে রাখেন বুঝি শাড়ির আঁচলে!

আপনি কি মহাস্থানগড়ের রেনুকা পাল?
এসেছেন আমার কাছে নদী নালা খাল
পার হয়ে ঝরাতে রক্ত আমার হৃদয়ে।”
[আমি মাধবীলতা, আপনি কে, নূরুল হক]

নূরুল হকের ‘আমি মাধবীলতা, তুমি কে’ শুনে জাহাঙ্গীর সেলিম ভাই কবিকে নিজের মুগ্ধতার কথা জানান এবং কবিতার ‘মাধবীলতা’ কে তা নিয়ে রসিকতায় ভরা প্রশ্ন করেন। কবি নূরুল হক সারাদিন সারামাস সারাবছর প্রেমিক কবি। মানুষও। তিনি এই পৃথিবী ও তার মানুষকে ভালোবাসেন বৈষম্যবিরোধী উদার অভিন্নতায়। তো জমে ওঠে আড্ডা ও আসর। এক ফাঁকে রনি আবারও পরিবেশন করেন কফি, পায়েস সেমাই ইত্যাদি। অতঃপর আয়োজনের মালিকিন রোকশানা পারভীন লীনা আবৃত্তি করেন তাঁকে নিয়ে লেখা আমিনুল ইসলামের ‘প্রেমের পাঠশালা’ নামক অন্ত্যমিলে সমৃদ্ধ কবিতাটি। লীনার কণ্ঠ খুবই মিষ্টি ও সুরেলা৷ একসময় তিনি ওস্তাদ রেখে গান শিখতেন। কিন্তু পরে আর অনুশীলন ধরে রাখতে পারেননি। অবশ্য নামাজ পড়া এবং গান শোনা তাঁর প্রায় নিয়মিত ভালোবাসা। তিনি মাঝে মাঝে তাঁর প্রিয় কোনো বাংলা- হিন্দি- উর্দু গান ধরেন কাজ করতে করতে, কখনো-বা স্নানের সময়। আমি জানালায় কান পাতা বাতাসের মতো চোরা কান পেতে উপভোগ করি তাঁর কণ্ঠের সুধা: “জানি বাহিরে আমার তুমি অন্তরে নও” কিংবা “ একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে..”। ‘প্রেমের পাঠশালা’ কবিতাটি আমিনুল ইসলাম এবং লীনার অন্তরঙ্গ সম্পর্ককে সামনে রেখে রচিত হয়েছিল যদিও তা সর্বজনীন আবেদনে সকল প্রেমিক-প্রেমিকা জুটির। উল্লেখ্য, বাচিকশিল্পী-কবি জাহানারা রেখার আবৃত্তিতে ইউটিউবে সহজলভ্য হয়ে আছে কবিতাটি। কবিতাটি সকল পাঠকের। রোকশানা পারভীন লীনার ভালোবাসার সৌজন্যে ছোট আকৃতির মিষ্টি কবিতাটি তুলে দিলাম:

“যখন তুমি ডাক দিয়েছো– অমনি গেছি ছুটে
যখন তুমি আসতেছিলে– দাঁড়িয়েছিলাম রুটে।
যখন আমি চেয়েছিলাম– বাড়িয়েছিলে হাত
যেই চেয়েছো আঁধার তুমি– অমনি আমি রাত।
শীতে যখন ঝরছো তুমি– পর্ণমোচীর ছবি
আমি তোমার দখিন হাওয়া- ফুলফাগুনের কবি।
আমি যখন টুঈন টাওয়ার– স্বপ্নে নাড়ি চাঁদ
তুমি ডেকে নামিয়েছিলে– দাওনি ছুঁতে ফাঁদ।
তুমি যখন অন্ধস্রোতে– ভাসিয়েছিলে- না
আমি তখন ভাটির দেশে– চাঁদের মোহনা।
আমি যখন প্রেমের খাতায়– ভুলের ভোলানাথ
পাঁচ দ্বিগুণে বারো তুমি—-আমার বাজিমাত !
সময় এখন ভূতে পাওয়া– সূত্রগুলো বিদ্ধ
আমরা কেবল রয়ে গেছি– নিপাতনে সিদ্ধ।”
[প্রেমের পাঠশালা]

রোকশানা পারভীন লীনার আবৃত্তির পর আবারও আবদুল হাকিম মুকুল। তিনি তাঁর ছাত্রজীবনে লেখা ‘নিয়তি’ নামক কবিতাটি পড়ে শোনান। কবিতাটিতে তাঁর প্রেম, বিশ্বচারী চিন্তা, মিথ সম্পর্কিত জ্ঞান ও বিশ্বসাহিত্যবিহারী মনের ছাপ আছে। মুকুল যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ শামসুজ্জোহা হলে আমার রুমমেট, তখন আবেগে উত্তাল প্রেমের কবিতা লিখতেন। আমরা তাঁর রুমমেটরা শুনে উপভোগ করতাম এবং হাততালি দিতাম। মুকুল তখন প্রায় ছ্যাকা পার্টি ; তাঁর একতরফা প্রেম বিফলে যায় যায় অবস্থা! আবেগ ও বিচ্ছেদ তাড়িত হৃদয় বিনিয়োগ করে তিনি অদ্ভুত সুন্দর প্রেমের কবিতা লিখতেন যেসবের মধ্যে তাঁর অদ্ভুত নিজস্বতা এবং শেক্সপীয়ার-বোদলেয়ার- কীটস মিশে থাকতো ব্যতিক্রমী সংশ্লেষে। বিগত ২০২৪ সালের অমর একুশে বইমেলায় ‘কবি প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত আবদুল হাকিমের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘সাংবিধানিক চেতনায় মুক্তির অন্বেষা’ ইতোমধ্যে সমাজচিন্তকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আশা করি, তাঁর কবিতার বইও শীঘ্রই আলোর মুখ দেখবে। প্রবন্ধের মতো কবিতা ভাবনাতেই তাঁর নিজস্বতার ছাপ স্পষ্ট। তাঁর পিাঠ করা ‘নিয়তি’ কবিতার শেষাংশ নিম্নরূপ:

‘দুর্বোধ্য মন্ত্রের আঁধারে বন্দি হয় প্রগতি
তবওু পিয়াসী চোখ মিনার্ভা ও ভেনাসের
ঐশ্বর্য খুঁজে ফিরে
খুজেঁ ফিরে মিরান্ডার দ্বীপ,
রোজালিন্ডের আর্ডেন
ভালকানের শিল্পকর্মের দিকে নিবদ্ধ তার
নির্লজ্জ লোলুপ চোখ

বৈষম্যের পাহাড় বিভক্ত করেছে মানষুকে
নিয়তি নির্ধারণ করেছে বস্তির অন্ধকারে
ব্যর্থ মানুষের অধিবাস
নিজ প্রকৃতিই অক্টোপাসের মত
অনাদি অনন্তকাল থেকে
ঘিরে আছে মানষুকে
তবওু দৃশ্যে আসেনি বিধাতা কখনো…’
[নিয়তি, মুঃ আবদুল হাকিম]

দীর্ঘ আড্ডা কিন্তু সময় চলছিল ঝরনার মতো ছন্দমাখা পায়ে — দ্রুত তালে। মাঝ আড্ডায় কবি নূরুল হক পাঠ করে শোনান তাঁর নিজের কবিতা ‘প্রেমের পঙক্তিমালা ’। দীর্ঘ কবিতা তবে প্রেমের নান্দনিক রসে সমদ্ধ। ফলে উপভোগ্য ছিল সবখানি। নূরুল হকের পর জাহাঙ্গীর সেলিম আবৃত্তি করেন মাতৃভাষা নিয়ে আমিনুল ইসলামের রচিত কবিতা ‘ভালোবাসার গল্প’। বয়সে আশি ছুঁতে চাওয়া জাহাঙ্গীর সেলিম ভাই কিছুটা মন্থর গতিতে আবৃত্তি করছিলেন তবে আবেগে ও উচ্চারণে ছিলেন সচ্ছল ও সাবলীল। প্রেমের কবিতার মোড়কে রচিত কবিতাটিতে প্রণয় রস বেশি। পাশে বসে সেলিম ভাবী উপভোগকরেছিলেন কোনো কথা বলে। এই পর্যায়ে বাচিকশিল্পী ও কবি শাহ নাওয়াজ গামা আবত্তি করেন তাঁরই নিজের ভাষায় তাঁর অন্যতম প্রিয় কবিতা ‘আসমানি ঘড়ি’। কবিতাটির রচয়িতা আমিনুল ইসলাম। উল্লেখ্য, শাহ নাওয়াজ গামার আবৃত্তিতে কবিতাটি ইউটিউবে পাওয়া যায়।

অতঃপর এই পর্যায়ে আমিনুল ইসলাম পাঠ করে শোনান তাঁর প্রিয় কবি আল মাহমুদের অতুলনীয় সুন্দর কবিতা ‘জেলগেটে দেখা’। তিনি কবিতাটি রচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। ১৯৭৪ সালের দিকে। আল মাহমুদ তখন কারাগারে। বাইরে দুর্ভিক্ষ। জাসদ, গণবাহিনী আর রক্ষীবাহিনীর তুলকালাম কাণ্ড। সেই সময় রফিক আজাদ রচন্স করেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ভাত দে হারামজাদা’ এবং আবুল হাসান রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত ‘অসভ্য দর্শন’ নামক কবিতা। আল মাহমুদ কারাগারে বসে বহু সংখ্যক বিখ্যাত কবিতা রচনা করেন যেগুলোর মধ্যে ‘জেলগেটে দেখা’ ‘কবি ও কালো বিড়ালিনী–১/২/৩’, ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, ‘বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার’, ‘ম্যাক্সিম গর্কি স্মরণে’, ‘কৃষ্ণকীর্তন’, ‘সক্রেটিসের মোরগ’, ‘চক্রবর্তীরাজার অট্টহাস্য’ প্রভৃতি কবিতা । যারা জেলখানায় ছিলেন না কোনোদিন অথবা জেলখানার ভেতর দেখার সুযোগ পাননি, তারা ‘জেলগেটে দেখা’ কবিতাটি পড়লে জেলখানার জীবন সম্পর্কে একটা মোটমুটি ধারণা পেয়ে যাবেন। অন্তরঙ্গ আনন্দ-বেদনার প্রাতিস্বিক অনুভবকে সর্বজনীন ব্যঞ্জনায় কতটা উপভোগ্য করে তোলা যায়, এ কবিতা তার সোনালি স্বাক্ষর বহন করছে। এই কবিতায় অসাধারণ সব বর্ণনা ও চিত্রকল্প আছে। যেমন:

“আর আমাকে ওরা রেখেছে বন্দুক আর বিচারালয়ের মাঝামাঝি
যেখানে মানুষের আত্মা শুকিয়ে যায়। যাতে
আমি আমরা উৎস খুঁজে না পাই।
কিন্তু তুমি তো জানো কবিদের উৎস কি? আমি পাষাণ কারার
চৌহদ্দিতে আমার ফোয়ারাকে ফিরিয়ে আনি।”
[জেলগেটে দেখা, আল মাহমুদ]

“আমি পাষাণ কারার চৌহদ্দিতে আমার ফোয়ারাকে ফিরিয়ে আনি”–এটাই হচ্ছে সাধারণ বন্দি এবং কবি-বিপ্লবী বন্দিদের মধ্যে পার্থক্য।এই পঙক্তিটি পড়ার সাথে সাথে কাজী নজরুল ইসলাম, বেনজির আহমদ, নাজিম হিকমত, ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা, বেঞ্জামিন মোলয়েসী প্রমুখ কবির কথা মনে পড়ে যায়। মনে আসে বিদ্রোহী কবি নজরুলের বিখ্যাত গানের ততোধিক বিখ্যাত লাইন: “ এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।’ ‘জেলগেটে দেখা’ কবিতায় দেখা যায়, কারাবাসীকে কবিকে দেখতে গেছেন তাঁর জীবনসঙ্গিনী সাথে নিয়ে টিফিনবাটি ভরতি খাবার। আর তার পূর্বে কবির প্রস্তুতিগ্রহণের নানা দৃশ্য। অনন্যসুন্দর। একটা অংশ তুলে দিলাম এখানে—

“চড়ুই পাখির চিৎকারে বন্দীদের ঘুম ভাঙছে।
আমি বারান্দা ছেড়ে বাগানে নামলাম।
এক চিলতে বাগান
ভেজা পাতার পানিতে আমার চটি
আর পাজামা ভিজিয়ে
চন্দ্রমল্লিকার ঝোপ থেকে একগোছা শাদা আর
হলুদ ফুল তুললাম।
বাতাসে মাথা নাড়িয়ে লাল ডালিয়া গাছ
আমাকে ডাকলো।
তারপর গেলাম গোলাপের কাছে।
জেলখানার গোলাপ, তবু কি সুন্দর গন্ধ!
আমার সহবন্দীরা কেউ ফুল ছিড়েঁ না,
ছিঁড়তেও দেয় না
কিন্তু আমি তোমার জন্য তোড়া বাঁধলাম।

আজ আর সময় কাটতে চায়না।
দাড়ি কাটলাম।
বই নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম।
ওদিকে দেয়ালের ওপাশে শহর জেগে উঠছে।
গাড়ীর ভেঁপু রিক্সার ঘন্টাধ্বনি কানে আসছে।
চকের হোটেলগুলোতে নিশ্চয়ই এখন
মাংসের কড়াই ফুটছে।
আর মজাদার ঝোল ঢেলে দেওয়া হচ্ছে
গরীব খদ্দেরদের পাতে পাতে।

না বাইরে এখন আকাল।
মানুষ কি খেতে পায়?
দিনমজুরদের পাত কি এখন আর
নেহারির ঝোলে ভরে ওঠে?
অথচ একটা অতিকায় দেয়াল
কত ব্যবধানই না আনতে পারে।
আ, পাখিরা কত স্বাধীন।
কেমন অবলীলায় দেয়াল পেরিয়ে যাচ্ছে
জীবনে এই প্রথম আমি
চড়ুই পাখির সৌভাগ্যে কাতর হলাম।”
[জেলগেটে দেখা, আল মাহমুদ]
‘জেলগেটে দেখা’ কবিতাটি পাঠ শেষ আবদুল হাকিম মুকুল তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পাঠের ঝুড়ি খুলে বসেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, একাত্তর, একাত্তর -পরবর্তী রাজনীতি এবং আর কত কি! জাহাঙ্গীর সেলিম, শাহ নাওয়াজ গামা, নূরুল হক, আমিনুল ইসলাম, আবদুল হাকিম মুকুল সবাই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী অবস্থার প্রত্যক্ষদর্শী। ফলে আলোচনা জমে উঠেছিল। হইচই। অবশ্য মারামারি বাঁধার কারণ ছিল না।

উল্লেখ্য, আড্ডায় কবিতা পাঠের মাঝে “বাহ বাহ”, “দারুণ” ইত্যাদি ধ্বনি এবং নানা ধরনের রসালো মন্তব্য আড্ডাকে লক্ষ্ণৌর কবিতার আড্ডা তথা “মুশায়রা” এর মতো করে তুলছিল। যারা ইউটিউবে লক্ষ্ণৌ-পাঞ্জাবের মুশায়রা দেখেন, যারার সেলিনা হোসেনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘যমুনা নদীর মুশায়রা’ পড়েছেন কিংবা যারা দেখেছেন ভারত ভূষণ-সুরাইয়া অভিনীত বলিউডের পুরোনো [১৯৫৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত] বিখ্যাত ছবি ‘মীর্জা গালিব’, তারা মুশায়রার বিষয়টি ভালো বুঝবেন। আড্ডায় কোনো সেন্সর বোর্ড ছিল না কিন্তু আড্ডায় অংশগ্রহণকারীগণ সবাই এক একজন স্বনিয়ন্ত্রিত মানুষ ছিলেন।

কবিতাপাঠ, আবৃত্তি ও আলোচনা শেষ হয় রাত দশটায়। তারপর? তার আর পর ছিল না? ছিল।সাবিনা ইয়াসমিন পলির নেতৃত্বে সমবেত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত বৈশাখ আবাহনের গান:

“এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।।
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।।
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক।।”

অনুষ্ঠানের পুরোটা সময় ছবি তুলে, ভিডিও করে এবং চা-কফি পরিবেশন করে সহায়তা লীনা, পলি ও রনি। আড্ডার আনুষ্ঠানিক শেষে রাতের ডাইনিং টেবিলে বেশাখী খাবার। পরিবেশনায় লীনা, লুবনা, প্রীতম, সজন ও রনি। খাওয়ার পর আরও একটি মুক্ত আড্ডা। অতঃপর নিজ নিজ বাসায় প্রত্যাবর্তন।

আড্ডায় অংশগ্রহণকারী এবং সাহয়তাকারী সবাইকে আবারও ধন্যবাদ।

শুভ নববর্ষ ১৪৩৩।
আমিনুল ইসলাম
কবি ও গবেষক

আরও পড়ুন।

‘পরদেশী মেঘ’ এর রোমান্টিক কবি – আমিনুল ইসলাম

আরও পড়ুন।

শাহানা সিরাজী : কবি এবং তাঁর কবিতা – আমিনুল ইসলাম

আরও পড়ুন।

দক্ষিণ কোরিয়ার কথাসাহিত্যিক হ্যান কাং সাহিত্যে নোবেল পেলেন

আরও পড়ুন।

একুশে পদক পাচ্ছেন ১৪ বিশিষ্টজন ও জাতীয় নারী ফুটবল দল

আরও পড়ুন।

১০ গুণী ব্যক্তিত্ব বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন

আরও সংবাদ পড়ুন।

অমর একুশে বই মেলা শুরু হচ্ছে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি

আরও সংবাদ পড়ুন।

জুলাই বিপ্লব বইমেলায় নতুন তাৎপর্য নিয়ে এসেছে : প্রধান উপদেষ্টা

আরও সংবাদ পড়ুন।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার -২০২৩ পাচ্ছেন ১৬ জন

আরও সংবাদ পড়ুন।

একুশে পদক ২০২৪ পেলেন ২১ জন বিশিষ্ট নাগরিক

আরও সংবাদ পড়ুন।

আগামী শনিবার একুশে পদক দেওয়া হবে

আরও সংবাদ পড়ুন।

সাত বিশিষ্ট ব্যক্তি – বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ পাচ্ছেন

আরও সংবাদ পড়ুন।

একুশে পদক গ্রহণ করলেন ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি

আরও সংবাদ পড়ুন।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরষ্কার-২০২২ পেলেন ১৫ জন বিশিষ্ট লেখক

আরও সংবাদ পড়ুন।

দক্ষিণ কোরিয়ার কথাসাহিত্যিক হ্যান কাং সাহিত্যে নোবেল পেলেন

আরও সংবাদ পড়ুন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলা একাডেমির সভাপতি হলেন

আরও সংবাদ পড়ুন।

ক্যাসিনো – সাগর চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top