করবি তিন – সাগর চৌধুরী
আদালত সেই দুপুরেই জামিন না মঞ্জুর করেন। আসামী আদালতেই পুলিশ জিম্মায় নিয়েছে। পাঁচফুট ছয় ইঞ্চি একজন প্রাপ্ত বয়স্ক যুবক। বাটা কোম্পানির বন্ধনীযুক্ত পাদুকা। মোটা পাজামা গাড়ো কালার। নামকরা কোম্পানির সাদা শার্ট। টকটকে ফর্সা সুন্দর পুরুষের হাতে এই প্রথম পুলিশের হাতকড়া পড়লো। হাসতে হাসতে পুলিশের সাথে প্রিজন ভ্যানে গিয়ে উঠলো আসামি।
সেদিনের মত আদালতের কার্যক্রম শেষ। সকাল ন’টা থেকে শুরু করে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত। সকলেরই অফিসিয়াল কার্যক্রম শেষে ফিরে যাবার পালা বরং আদালত পাড়ায় আইনজীবীদের সাথে বিচারকরাও দাড়িয়ে দেখছিলেন।
আসামি হাসতে হাসতে কোর্টপুলিশের সাথে বেড়িয়ে যাচ্ছে।
৩৮৫ ধারা মামলা।
সন্ধ্যা হওয়ার আগের মুহুর্তে পাখিগুলোর ডাকাডাকির শব্দে চারদিক স্তব্ধ। হাজত খানার ভেতরের দৃশ্য অবর্নীয়। কেউ গান গাইছে গলা ছেড়ে। কেউ বিড়ি টানছে। ধুয়ো ফুঁকছে। কেউ হাউমাউ করে কান্না কাটি করছে। নানা রকম শব্দে আর বিড়ির ধুয়ো দমবন্ধ হয়ে যাবার যোগাড়।
এক এক করে গুনে গুনে কোর্টপুলিশের গাড়িতে তোলার জন্য প্রত্যেককে দাঁড় করানো হলো। চারদিকে তখন আলোর লাইটগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শীতের শেষ। কিন্তু এখনো শীতের আবেশ রয়ে গেছে। কুয়াশা পড়ছে। হেঁটে যাওয়ার সময় বেশ শীত অনুভব হলো। সন্ধ্যার আকাশে তারা উঠে গেছে। প্রিজন ভ্যান চলা শুরু করলো।
আদালতের গাড়দখানার সিমানা ছেড়ে। জেলা জজ আদালতের মেইনগেইট পেছনে ফেলে ছুটলো গাড়ি। এরই মধ্যে প্রিজনভ্যানের জানালা দিয়ে দেখা গেল। ডিসি অফিসের সামনে দিয়ে। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে চিরচেনা পুকুর পাড় হয়েই নির্বাচন অফিস।
সরকারি স্কুলের পাঠের পাশ দিয়েই ট্রাফিক পেড়িয়ে ব্রীজ। পাশের রাস্তা ধরে চললো গাড়ি। জেলা কারাগারের দিকে।
পুলিশ লাইনের পাশে গিয়েই থামলো প্রিজনভ্যান।
জেলপুলিশের মুখের সর্তক্য সংকেত। গেটখুলে একে একে গুনে গুনে বাহিরে নিয়ে আসা হলো আসামিদের।
সন্ধ্যার আধো-অন্ধকার পেড়িয়ে গাঢ় অন্ধকার। জেল খানার ছোট পকেট গেট দিয়ে ভেতরে নেওয়া হলো সব আসামি। এবার জেল খানার নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক আসামিকে নাম ঠিকানা জিজ্ঞেসা নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেসা করা।
এরপর ভেতরে নেওয়া হলো। সাথে জেল পুলিশের দল। কার কি পেশা। কে কি মামলায় ভেতরে ঢুকছে সেই বিষয়ে জানিয়ে দেওয়া হলো।
চলার রাস্তা শক্ত। শক্ত রাস্তায় হাটতেই টের পাওয়া যায়। শীতের সবজি ফুলকপি, বাধাঁকফিসহ আরো অনেক ধরনের সবজি। বরাবর গেট। গেট পেড়িয়ে মুল ফটক। মোটা মোটা লোহার পিলার সিমেন্টের। ভেতরে ডুকতেই রব পড়লো।
কে এসেছে! কে এসেছে।
অল্প সময়ের মধ্যেই আমদানি রুমের দরোজায় মোটা মোটা তালা লাগিয়ে দিয়ে বাহিরের লাইট জ্বালিয়ে দেওযা হলো। বাহিরে শীত। ভেতরে সবাই কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে আছে। সাড়াশব্দ নাই। অবাক করার মত ব্যাপার হলো। জেলপুলিশ তালা লাগিয়ে যাওয়ার পর পরই সবাই কম্বল মুড়িয়ে উঠে বসলো।
যারা যারা নতুন জেল খানায় এসেছেন সবাইকেই পরিচয় ঠিকানা কর্মস্থল সহ বলতে হয়। এরপর নতুনরন আগে পুরাতনরা পরে খেতে বসে।
সরকারের বরাদ্দ সিলভারের থালা। প্লাস্টিকের হাড়ি, চামচ, শৌচাগারের বদনা। যদিও প্রতিটি বাথরুমের দরজা অর্ধেক। দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার মত বাজে দুর্গন্ধ।
খাওয়া দাওয়ার পর চা চক্র। দেয়াল ঘড়ির কাটা কট কট শব্দ করছে। রাত আটটা তিরিশ মিনিট। বিড়ি সিকারেটের ধোঁয়া চারদিকে ছাড়িয়ে পড়লো। বিড়ি সিকারেট যারা না পান করেন অনেকেই একপাশে গিয়ে দাড়ান।
জেলের নিয়ম অনুযায়ী লাইট নিবে না। জেলপুলিশরা দূরের দাঁড়িয়ে পাহাড়ায়। শীতের কুয়াশা জানালার গ্লাস চুয়ে পড়ে শিশির। কেউ কেউ এখনো সিকারেটে শেষ টান দিচ্ছেন। কম্বল মুড়ে আছেন অনেকেই। কেউ একজন বাথরুমের দিকে হেটে গেলেন। একজন দাড়িয়ে লুঙ্গি ঠিক করে বেঁধে নিচ্ছেন কোমরে। এরই মধ্যে একপাশে মিটিমিটি আলো জ্বলে উঠলো। সিকারেটের ধোঁয়া। চা তৈরীর গন্ধ ভেসে এলো।

























