প্রিয় হারানো সময়
বার বার মনে পড়ছে তোমাকে।
যখন চারদিক জনশূন্য ছিলো, যখন দাপ্তরিক কাজ করতো সকলেই বেড় রুমে বসেই মাস্ক পরে, যখন স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে,পিতা সন্তানকে, সন্তান পিতাকে ফেলে চলে যেতো ঠিক তখন খায়রুন নাহার লিপি, মুক্তি,মনি,মাহবুব,আলম নাশরাহ অংকুর,পারভীন শিকদারসহ আমরা রাস্তায় রাস্তায় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যুদ্ধ করছি। রাস্তায় যানবাহন নেই,তবুও আমাদের পা থামেনি। কামরুল স্যার, জুয়েলভাই আমাদের সাথে অগ্রপথিক ছিলেন। আমাদের একজনের পিতা-মাতা সেই ভয়াল করনার ছোবলে একই সপ্তাহে বিদায় নিয়েছেন কারুকার্যময় দুনিয়া থেকে। তবুও সে থামেনি। বাংলাদেশ বেতার থেকে প্রচারিত হতো, আমি খায়রুন নাহার লিপি, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা বই খোলো,আমাদের আজকের পাঠ’ শিশুর পণ”।
রাতভর আমি স্ক্রিপ্ট ডেভেলপ করতাম। সারাদিন তা রেকর্ড করতাম বাংলাদেশ বেতারের স্টুডিওতে। আবার রাত ভর কারেকশন করতাম আমি নিজেই।
আমাদের সে যুদ্ধের ফলাফল ভালো হোক বা মন্দ হোক আমরা যুদ্ধ থামাইনি।
আজ সে সব খুব মনে পড়ছে, কেন মনে পড়ছে জানি না!
তখন আমার আটত্রিশ হাজার টাকার টিএবিল আমি পাইনি।
আমার অফিস বলেছে অধিদপ্তরে যান। অধিদপ্তর আমার বিল ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
মুসলিম হিসেবে যেহেতু আখিরাতে বিশ্বাস করি, নিশ্চয়ই একদিন ওই শিশুদের প্রফুল্ল হৃদয়ের মহোৎসব হতে খোদাতায়ালা আমাকে পুরস্কৃত করবেনই!
একই পদে কাজ করছি এক যুগ হয়েছে। ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী আমাদেরকে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড দেয়ার কথা। আমাদের সহকর্মী ভাই-বোনেরা আমার ঘাড়ে দায়িত্ব তুলে দিয়েছে।কিন্তু দু বছরেও অধিদপ্তর তা সুরাহা করেনি।
প্রিয় চ্যালেঞ্জিং সময়, আমি বার বার অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ে ধর্না দিয়েই ব্যর্থ হচ্ছি। তবুও ঊর্ধ্বতনের সাথে জোর করিনি,মিছিল করিনি, মিটিং করিনি। ধৈর্য ধরেছি।
সে সময় আমিও মরে যেতে পারতাম। কারণ সেই ব্লাইন্ড সময়ে আমিও করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আইসিইউতে ছিলাম। আমার চিকিৎসার টাকা সেই প্রজেক্ট দিয়েছে?
আমি দাবীও করিনি। কারণ দেশের জন্য,আগামী দিনের নাগরিকের জন্য কাজ করার সুযোগ হাতছাড়া করিনি।
খায়রুন নাহার লিপিদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিলো দৃঢ়, সুদীপ্ত। সবাই প্রাণ ঢেলে কাজ করেছে।
গতরাতে সেই দুঃস্বপ্ন খুব তাড়া করছিলো। আমার ব্যক্তিগত জীবনে এসেছিলো ম্যাসাকার! কারণ তখন অর্ডার ছিলো কেউ স্টেশন লিভ করতে পারবে না। করিনি। দিনের পর দিন, ছুটোছুটি করেছি খুশিমনে।
প্রিয় ক্লান্তিময় সময়,
তুমি জানো এ দেশটি এমনই অন্ধকারাচ্ছন্ন যে আমরা ভালো কিছু ভাবতেই পারি না। আমাদের অধিকার ধুলোয় গড়ায়, আমাদের সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হয়।
কারণ আমরা মাটির সাথে মিশে আছি। আমাদের বুকেই সবুজ ঘাস জন্মায়। সে ঘাসের ওপর পা রাখে সৌখিন পদযাত্রীরা, যারা নিজের পায়ে নরম শিশিরভেজা ঘাসের স্পর্শ লাগলে তারা পুলকিত হয়! আমাদের কষ্ট,আমাদের পরিশ্রম কখনোই স্বীকৃতি পায় না স্নিগ্ধ পায়ের অধিকারীরা!
তবুও আমরা প্রত্যয় ব্যক্ত করি- যতোদিন ডিপার্টমেন্টে কাজ করবো ততোদিন যেখানেই পোস্টিং হোক কাজ করবো। যদি না পারি, শরীর আর না কুলায়, তাহলে রিজাইন দিয়ে দুহাত খোদাতায়ালার কাছে বিলিয়ে দেবো। ন্যায় বিচার সেখানে আছে। দুর্বলের প্রথম ও শেষ আশ্রয়স্থল মহান স্রষ্টা।
অনেকেই কোয়ান্টাম করে,তবুও সততা ফিরে আসে না।
আমাদের কোয়ান্টাম প্রয়োজন নেই। আমরা শেখাই। আমরা শিক্ষক। নবীরাও শেখাতেন। তাঁরাও জুলুমের শিকার হয়েছেন। আমরা তো সামান্য কেউ।
প্রিয় প্যাথেটিকসময়,
এ দেশ, এ মাটি পরম মমতায় যেমন আমাদেরকে আলো হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে তেমনি আমরাও মাতৃসলিলাহৃদয়োত্থিত
স্নেহে মাটিকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই।
পরিযায়ী পাখিরা আসবে যাবে
তারা কখনো এ মাটিকে ভালোবাসবে না।
আমরাও তো ভালো না বেসে থাকতে পারি না, কী বলো সময়?
চলছি তো চলবোই
মরেছি তো মরবোই
পলিথিন উপড়ে দেবোই।
তোমারই বিদগ্ধ ছায়াবতী।
শাহানা সিরাজী
কবি, প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক।
আরও পড়ুন।
আরও পড়ুন।
আরও পড়ুন।



























