পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা
এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল, লুটেরা গোষ্ঠীর নিখুঁত ষড়যন্ত্রে বিভ্রান্ত বিএফআইইউ
অর্থনৈতিক রিপোর্টারঃ পাচারকৃত টাকা, অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধার অভিযানের মধ্যে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রধান শাহীনুল ইসলামকে ঘিরে নানামুখী ষড়যন্ত্রের তথ্য সামনে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে লুটেরা গ্রুপ একাট্টা হয়ে ষড়যন্ত্রে নেমেছে। এই কাজে এআই দিয়ে নিখুঁত ভিডিও তৈরি করে শুরুতে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা ও পরবর্তীতে সফল না হয়ে এগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। এই বিশেষ গোষ্ঠী কৌশলে ছড়াচ্ছে নানা কাল্পনিক অভিযোগও। এই গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যোগ দিয়েছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ভেতরে থাকা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুগতরা।
•
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশ থেকে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে আলোচিত ১০ প্রতিষ্ঠান দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে হাতিয়ে নিয়েছে ৪ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খেকো এস আলমই হাতিয়ে নিয়েছেন সওয়া দুই লাখ কোটি টাকা।
বসুন্ধরা, সামিট, বেক্সিমকো, সিকদার, ওরিয়ন গ্রুপ, সাবেক এমপি ইকবাল, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানসহ বিগত সরকারের আস্থাভাজন শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যক্তিরা কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে দেশের ভিতরে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে পাচারের তালিকায় নাবিল গ্রুপেরও নাম রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক দেশে পাচারের টাকায় গড়া ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটসহ আরো কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
তদন্তে স্বৈরাচার হাসিনা ঘনিষ্ঠ অর্থপাচার চক্রটির তথ্য উঠে আসার পর এমন বিতর্ক অভিযান থামাতে চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিবারের জন্য নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে। যা পাচারকারীদের চক্রান্ত, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একটি চরম ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি ফেসবুক থেকে শাহীনুলের একটি পুরনো ছবি নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অশ্লীল রূপ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এ নিয়ে বিপরীত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে এই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে যিনি গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছেন।
জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৮ আগস্ট পদত্যাগে বাধ্য হন বিএফআইইউ’র তৎকালীন প্রধান মাসুদ বিশ্বাস। এরপর থেকেই পদটি শূন্য ছিল। শূন্য পদে নিয়োগের জন্য গত বছরের ৩ নভেম্বর বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ২৯টি আবেদন জমা পড়ে এবং মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় ১০ জনকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, মৌখিক পরীক্ষার পর প্রাথমিকভাবে যে তিনজনের নাম অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিতর্কিত গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আসে গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোতে। এর প্রেক্ষিতে কোনো অভিযোগ না থাকায় তালিকায় চার নম্বরে থাকা শাহীনুল ইসলামকে নিয়োগ দেয় সরকার।
বিএফআইইউ’র একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মনোবল ভেঙে দিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এর প্রধানের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের থেকে প্রশ্ন উঠেছে, অর্থ পাচার চক্রের প্রভাবের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী নতিস্বীকার করবে, নাকি অহেতুক সমালোচনায় কান না দিয়ে অর্থ উদ্ধারের চলমান প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তাও বলছেন, এসব অভিযোগ বা সমালোচনা উদ্দেশ্যমূলক। এখানে শাহীনুলের কি দোষ? জাতীয়ভাবে দেশের কোনো ক্ষতি হয়নি, ব্যাংকিং খাত থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি। শুধুমাত্র একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে এটি করা হচ্ছে। গোষ্ঠীটি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শাহীনুলকে সরিয়ে নিজস্ব লোক বসিয়ে তাদের কার্যসিদ্ধি হাসিল করতে চাচ্ছে।
সহকর্মীরা বলেন, যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা চাকরিক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘন বা অপরাধ সংশ্লিষ্ট নয়।
সাইবার অপরাধ গবেষণাকারী বেসরকারি সংগঠন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ছবিটি উদ্দেশ্যমূলক, চাকরির নীতিবিরোধী অপরাধ নয়। সাইবার আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, ছবিটি ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে ছড়ানো। যা সাইবার অপরাধ এবং আইন অনুযায়ী অজামিনযোগ্য।
বিএফআইইউ অর্থপাচার (মানি লন্ডারিং), সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিস্তার রোধে গঠিত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সংস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীন এ বিভাগটি সন্দেহজনক ও নগদ লেনদেন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে। মূল লক্ষ্য—আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।


























